সেচের পানিতে ‘লুকানো’ নাইট্রোজেন: কৃষিতে সারের হিসাব বদলে দেবে কী ?

কৃষিজমিতে সেচের পানি দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ফসলের পানির চাহিদা পূরণ করা। কিন্তু সেই পানির সঙ্গে আমাদের অজান্তেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নাইট্রোজেনও মাটিতে পৌঁছায়। অথচ প্রচলিত সার ব্যবস্থাপনা ও কৃষিজ নাইট্রোজেনের হিসাব তৈরির সময় এই নাইট্রোজেনকে অনেক ক্ষেত্রেই বিবেচনায় নেওয়া হয় না। সেচের পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছানো এই উপেক্ষিত নাইট্রোজেনের বৈশ্বিক চিত্র উঠে এসেছে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার সাসটিইনেবিলিটিতে প্রকাশিত প্রবন্ধে।

গবেষকেরা বিশ্বের সেচনির্ভর কৃষিজমিতে সেচের পানির সঙ্গে কত পরিমাণ নাইট্রোজেন প্রবেশ করছে, সেটি নিরূপণের চেষ্টা করেছেন। ভূগর্ভস্থ পানি, নদী ও অন্যান্য ভূপৃষ্ঠের জলাশয়ে কৃষিজমি থেকে ধুয়ে যাওয়া সার, পানি প্রবাহ এবং দীর্ঘদিনের কৃষিকাজের ফলে নাইট্রেট জমতে পারে। পরে সেই পানি আবার সেচের জন্য জমিতে ফিরিয়ে আনা হলে পানির সঙ্গে নাইট্রোজেনও কৃষিজমিতে ফিরে আসে। গবেষকেরা এই প্রক্রিয়াকে এমন একটি চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে সেচের জন্য পানি তোলার সঙ্গে আগের নাইট্রোজেনও আবার জমিতে ফিরে আসে। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে সেচের পানিতে সার মেশানোর ঘটনা নয়; বরং পানিতে আগে থেকেই থাকা নাইট্রোজেন অনিচ্ছাকৃতভাবে জমিতে পৌঁছায়।

এই বৈশ্বিক বিশ্লেষণের জন্য গবেষকেরা ১০৫টি পৃথক উৎস থেকে মোট ১ হাজার ৩২৫টি মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করেন। এসব পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন ফসল, দেশ, সেচের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট নাইট্রোজেন প্রবাহের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর মাঠপর্যায়ের তথ্যকে বিশ্বব্যাপী কৃষিজমির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে মেশিন-লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের গড় পরিস্থিতিকে ভিত্তি ধরে প্রায় প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য বিভিন্ন ফসলে সেচের পানির মাধ্যমে পৌঁছানো নাইট্রোজেনের পরিমাণ অনুমান করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফল বলছে, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে সেচের পানির মাধ্যমে জমিতে পৌঁছানো নাইট্রোজেনের মধ্যম পরিমাণ ছিল হেক্টরপ্রতি বছরে ১৯ কেজি। তবে অঞ্চলভেদে এই পরিমাণে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। মোট পর্যবেক্ষণের প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে সেচের পানির মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি বছরে ১০০ কেজিরও বেশি নাইট্রোজেন জমিতে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক হিসাবে সেচের পানি বছরে প্রায় ১৪ টেরাগ্রাম নাইট্রোজেন কৃষিজমিতে পৌঁছে দেয়। এই পরিমাণ বিশ্বের কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের প্রায় ১৩ শতাংশের সমান।

এই নাইট্রোজেন প্রবাহ পৃথিবীর সব অঞ্চলে সমান নয়। গবেষণায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চমাত্রার অঞ্চল শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে বিস্তৃত অঞ্চলগুলোর একটি উত্তর আফ্রিকার নীল নদের বদ্বীপ থেকে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া হয়ে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধানচাষ এলাকা, পূর্ব চীন ও জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ কৃষি অঞ্চলেও সেচের পানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নাইট্রোজেন জমিতে পৌঁছানোর চিত্র পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নিবিড় সেচনির্ভর কৃষি অঞ্চল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সেচের পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে নাইট্রোজেন প্রবেশের বৈশ্বিক বিস্তার ও প্রধান উচ্চমাত্রার অঞ্চল। মানচিত্রে ২০১০–২০১৯ সালের গড় পরিস্থিতিতে সেচের পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে প্রবেশ করা নাইট্রোজেনের পরিমাণ দেখানো হয়েছে। রঙের তারতম্য হেক্টরপ্রতি বছরে নাইট্রোজেন প্রবেশের মাত্রা নির্দেশ করে; লাল রঙের অঞ্চলগুলোতে এই প্রবাহ সবচেয়ে বেশি। মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর আফ্রিকা–পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব চীন–জাপানের প্রধান উচ্চমাত্রার অঞ্চল বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। মূল গবেষণায় ১০০ কেজি নাইট্রোজেন হেক্টর⁻¹ বছর⁻¹-এর বেশি প্রবাহকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উৎস: Serra, J. et al. (2026), Nature Sustainability, “Global analysis of nitrogen inputs from irrigation water to cropland.” মূল প্রবন্ধটি Creative Commons Attribution–NonCommercial–NoDerivatives 4.0 International (CC BY-NC-ND 4.0) লাইসেন্সের অধীনে প্রকাশিত।

দেশভিত্তিক হিসাবেও বড় পার্থক্য রয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, চীনের কৃষিজমিতে সেচের পানির মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ২ টেরাগ্রাম নাইট্রোজেন পৌঁছায়। এটি ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় চার গুণ। ভারতে এই পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ২ টেরাগ্রাম এবং পাকিস্তানে ১ দশমিক ১ টেরাগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ৮ টেরাগ্রাম নাইট্রোজেন সেচের পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছায়।

গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সেচের পানিতে থাকা এই নাইট্রোজেনকে প্রচলিত সার প্রয়োগের পরামর্শ এবং কৃষিজ পুষ্টির হিসাবে অনেক সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে কৃষক যদি না জানেন যে সেচের পানির সঙ্গে তাঁর জমিতে ইতিমধ্যেই কত নাইট্রোজেন পৌঁছাচ্ছে, তাহলে তার ওপর আবার প্রচলিত মাত্রায় কৃত্রিম সার প্রয়োগ হতে পারে। এতে ফসলের প্রয়োজনের তুলনায় জমিতে মোট নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অতিরিক্ত নাইট্রোজেন শুধু সারের অপচয় বাড়ায় না; এর একটি অংশ জমি থেকে ধুয়ে ভূগর্ভস্থ পানি ও নদী-খালে পৌঁছাতে পারে। ফলে পানিদূষণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সেচের পানিতে থাকা নাইট্রোজেনের পরিমাণ আগে থেকে জানা থাকলে কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সার কমিয়ে দিতে পারেন। এতে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতাও বাড়তে পারে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বৈশ্বিক কৃষিতে বাইরে থেকে প্রয়োগ করা কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ওপর নির্ভরতা প্রায় ৭৫ শতাংশ। সেচের পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে ফিরে আসা নাইট্রোজেনকে একটি পুনর্ব্যবহৃত পুষ্টি-উৎস হিসেবে ধরে সমপরিমাণ কৃত্রিম সার কমানো গেলে এই নির্ভরতা হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, বাস্তবে এই সুবিধা সব অঞ্চলে সমান হবে না। কারণ সেচের পানিতে নাইট্রেটের পরিমাণ, সেচের মাত্রা, ফসলের ধরন এবং স্থানীয় সার ব্যবস্থাপনা অঞ্চলভেদে ভিন্ন।

এই গবেষণা তাই শুধু একটি বৈশ্বিক পরিসংখ্যান তুলে ধরেনি; কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনেছে, সেচের পানির সঙ্গে জমিতে কত নাইট্রোজেন যাচ্ছে, তা কি সার দেওয়ার আগে জানা হচ্ছে?

গবেষকেরা মনে করেন, সেচের পানিতে নাইট্রেটের পরিমাণ নিয়মিত পরীক্ষা করা গেলে কৃষকেরা পানির সঙ্গে আসা নাইট্রোজেনের হিসাব ধরে প্রয়োজনীয় সারের মাত্রা নির্ধারণ করতে পারবেন। সহজ ও কম খরচের নাইট্রেট পরিমাপের ব্যবস্থা, উপগ্রহভিত্তিক সেচ পর্যবেক্ষণ, কৃষকদের তথ্য জানানোর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সহায়তা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গবেষণার ফলাফলকে প্রতিটি এলাকার জন্য সরাসরি সার ব্যবহারের নির্দেশনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। লাতিন আমেরিকা, সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চল মাঠপর্যায়ের তথ্যভান্ডারে তুলনামূলকভাবে কম প্রতিনিধিত্ব করেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানিতে নাইট্রেটের ঘনত্বের সূক্ষ্ম স্থানভিত্তিক মানচিত্র না থাকায় গবেষকদের কিছু পরোক্ষ তথ্য ব্যবহার করতে হয়েছে। তাই কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সার ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে সেচের পানির পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে গবেষণাটি দেখায়, কৃষিতে সেচের পানি শুধু পানির উৎস নয়; অনেক অঞ্চলে এটি একটি উল্লেখযোগ্য নাইট্রোজেনের উৎসও। দীর্ঘদিন প্রায় অদৃশ্য থেকে যাওয়া এই নাইট্রোজেন প্রবাহকে সঠিকভাবে হিসাবের মধ্যে আনা গেলে অপ্রয়োজনীয় সার ব্যবহার কমানো, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয়, পানিদূষণের ঝুঁকি হ্রাস এবং নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরো দেখান
Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading