চট্টগ্রামে ভূমিধ্বসঃ সাম্প্রতিক গবেষণা যে বিপদজনক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে
চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি নতুন কিছু নয়। বর্ষা এলে এই শহর বৃষ্টি দেখে, জলাবদ্ধতা দেখে, পাহাড়ধ্বসের সতর্কতা দেখে। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বৃষ্টি চট্টগ্রামকে আবার এক কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে শহরের সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের রেকর্ড ছিল ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্টের ৪১১ মিলিমিটার।
এই বৃষ্টি শুধু রাস্তা ডুবায়নি, মানুষের জীবনও কেড়ে নিয়েছে। টানা বৃষ্টির মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিন জেলায় ভূমিধস ও দেয়ালধ্বসে তিন দিনে ২২ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও ছিল। চট্টগ্রাম শহর ও সীতাকুণ্ডে আলাদা ভূমিধ্বসে দুই শিশুর মৃত্যুর খবরও এসেছে। একই সময়ে কক্সবাজারের পাহাড়ি রোহিঙ্গা শিবিরেও বৃষ্টিজনিত ভূমিধ্বসে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
এই খবরগুলো পড়লে মনে হতে পারে, দুর্যোগটি হঠাৎ এসেছে। কিন্তু চট্টগ্রামের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, অতিবৃষ্টি, পাহাড় কাটা, বন কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বসতি, রাস্তা নির্মাণ ও দ্রুত নগরায়ণের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় এই বিপদ একদিনে তৈরি হয়নি। পাহাড় হঠাৎ ভেঙে পড়ে না; অনেক সময় পাহাড় বহু বছর ধরে দুর্বল হতে থাকে, আর একদিন ভারী বৃষ্টি সেই দুর্বলতাকে দৃশ্যমান করে দেয়।
সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা চট্টগ্রামের এই ঝুঁকিকে বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরেছে। একটি গবেষণা চট্টগ্রাম জেলায় ভবিষ্যৎ মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি নিয়ে, অন্যটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নগর ও নগর-সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধ্বসের ঝুঁকি নিয়ে। প্রথম গবেষণাটি করেছেন মনিরা জাহান তানিয়া, সানজিদা মুর্শেদ, মুসাব্বির আহমেদ আরাফি, অ্যামি এল. গ্রিফিন, মেহেদী হাসান পিয়াস, মনসুর আলমাজরুই, মহেশ বাদে ও মো. আশরাফুল ইসলাম। দ্বিতীয় গবেষণাটি করেছেন মো. আশরাফুল ইসলাম, মুসাব্বির আহমেদ আরাফি, মেহেদী হাসান পিয়াস, তানভীর হোসেন, মো. মেহেদী হাসান, সানজিদা মুর্শেদ ও মনিরা জাহান তানিয়া। দুটি গবেষণার বিষয় আলাদা হলেও সতর্কবার্তা একই দিকে যায়। একদিকে চট্টগ্রামের মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে; অন্যদিকে নগর-সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দুই সময়েই গুরুত্ব দাবি করছে।
পাহাড়ি চট্টগ্রাম কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ ?
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি ও উপকূলীয় সংযোগ অঞ্চলে অবস্থিত। এই অঞ্চল শুধু পাহাড়ি নয়, এটি দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্রও। বন্দর, শিল্প, রাস্তা, বসতি, কৃষি, পাহাড়ি ঢাল, নদী-খাল, বনভূমি, সব মিলিয়ে এখানে প্রাকৃতিক ও জনসংখ্যার চাপ একসঙ্গে কাজ করে।
ভূমিধ্বস বিষয়ক গবেষণাটি থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এলাকা বা সিডিএ প্রায় ১,১১৩ বর্গকিলোমিটার। এই অঞ্চল বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরকেন্দ্রের অংশ, যেখানে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগর সম্প্রসারণ ঘটছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৭ সালের বড় ভূমিধসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আরও বড় পরিসরে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে ছয়টি ভূমিধসের ঘটনায় ২৬৫ জন নিহত এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ইতিহাস আমাদের বলে, চট্টগ্রামের ভূমিধ্বস কোনো নতুন বিপদ নয়। নতুন যা হচ্ছে, তা হলো এই পুরোনো বিপদের সঙ্গে এখন আরও ঘন ও তীব্র বৃষ্টি, দ্রুত ভূমি ব্যবহারের ধরনের পরিবর্তন এবং পাহাড়ি ঢালে মানুষের বসতি এক বড় বিপদের দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে।
বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ধসের সম্পর্ক সহজ ভাষায় এমন: দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হলে পানি মাটির ভেতরে ঢুকে যায়। মাটি ভারী হয়, ঢালের ভেতরে পানির চাপ বাড়ে, মাটির কণাগুলোর বন্ধন দুর্বল হয়। ঢাল যদি আগে থেকেই কাটা, খোঁড়া, গাছহীন বা অস্থিতিশীল থাকে, তাহলে সেই ঢাল ভেঙে পড়তে পারে। গবেষণাটিও বলেছে, দীর্ঘ বৃষ্টি ঢালকে দুর্বল করে ভূমিধসের সম্ভাবনা বাড়ায়।
মাটি ক্ষয়: ধীর বিপদ, বিপদজনক পরিণতি
আমরা যদি প্রথম গবেষণাটির উপর আলোকপাত করি, এটি সরাসরি ভূমিধ্বস বিষয়ক নয়, এটি মাটি ক্ষয় বা “সয়েল ইরোসোন” নিয়ে একটি ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে মাটি ক্ষয় হলো ঢাল দুর্বল হওয়ার একটি বড় পথ। বৃষ্টির পানি যখন পাহাড়ি জমির উপর দিয়ে নেমে যায়, তখন মাটির উপরিভাগ ধুয়ে নেয়। গাছপালা থাকলে পাতার আঘাত, শেকড়ের বাঁধন ও মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা মাটি রক্ষা করে। কিন্তু বন কমে গেলে, পাহাড় কাটা হলে, রাস্তা বা বসতি বানাতে ঢাল কেটে ফেলা হলে, বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে আঘাত করে। তখন ক্ষয় দ্রুত হয়। গবেষণাটি চট্টগ্রাম জেলার পুরো ৫,২৮২.৯২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে কাজ করেছে। তারা বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতি, দুই দিকই দেখেছে। এতে ঢাল, উচ্চতা, দিক, নদী থেকে দূরত্ব, রাস্তা থেকে দূরত্ব, মাটির ধরন, ভূতত্ত্ব, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, গাছপালার ঘনত্ব, ভূমি ব্যবহারসহ মোট ১৮টি কারণ বিবেচনা করা হয়েছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা শুধু ভবিষ্যৎ বৃষ্টিপাত নয়, ভবিষ্যৎ তাপমাত্রা ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনও যুক্ত করেছে। আগে অনেক গবেষণা শুধু বৃষ্টি বদলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি দেখত; এখানে একসঙ্গে বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন ধরা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল উদ্বেগজনক। বর্তমান অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলার ৩১.৫৩ শতাংশ এলাকা উচ্চ থেকে অতি উচ্চ মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বনিম্ন প্রভাব বিবেচনা করেও ২০২১–২০৪০ সময়ে মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি ৩৭.৬৯ শতাংশ এবং ২০৪১–২০৬০ সময়ে ৩৯.৫৫ শতাংশে যেতে পারে। আর সর্বোচ্চ প্রভাব বিবেচনায় ২০২১–২০৪০ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ৪৩.১১ শতাংশ এবং ২০৪১–২০৬০ সময়ে ৪৬.২৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা উচ্চ মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই গবেষণায় ফটিকছড়ি, মিরসরাই, বাঁশখালী ও রাঙ্গুনিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মাটি ক্ষয়-ঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকরা বলেছেন, এসব এলাকায় ঢাল স্থিতিশীল করা, গাছ লাগানো, পাহাড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা ও বসতি পরিকল্পনায় মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।

মূল গবেষণাপত্রের লিঙ্কঃ https://doi.org/10.1007/s41748-026-01079-6
গবেষণার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে: গাছপালার ঘনত্ব, ঢাল, উচ্চতা ও ঢালের দিক, এই কারণগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দুই সময়েই মাটি ক্ষয়ের বড় নিয়ামক। কম গাছপালা ও খাড়া ঢাল একসঙ্গে থাকলে ক্ষয় ও ভূমিধ্বস দুই ঝুঁকিই বাড়ে। দ্রুত নগরায়ণ, কৃষি সম্প্রসারণ ও শিল্পায়ন চট্টগ্রামে স্বাভাবিক গাছপালাযুক্ত ভূমিকে বসতি, রাস্তা ও চাষের জমিতে বদলে দিচ্ছে; এতে মাটির সুরক্ষা কমে এবং বৃষ্টির পানি সহজে মাটি ধুয়ে নিতে পারে। এখানে বড় বার্তাটি হলো: মাটি ক্ষয় শুধু কৃষির ক্ষতি নয়। এটি পাহাড়ি ঢালকে দুর্বল করে, নদী-খালে পলি জমায়, রাস্তা-ঘরবাড়ি ঝুঁকিতে ফেলে, আর দীর্ঘমেয়াদে ভূমিধসের পটভূমি তৈরি করতে পারে।
ভূমিধসের মানচিত্র: কোথায় বেশি সতর্কতা দরকার
দ্বিতীয় গবেষণাটি আরও সরাসরি। এটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছে। গবেষকরা মাঠ পর্যবেক্ষণ ও আগের প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে ৩৫৮টি ভূমিধ্বস ও ভূমিধ্বস নয়, এমন স্থান ব্যবহার করেছেন। এরপর ভূমিধ্বসের বিভিন্ন কারণ যেমনঃ উচ্চতা, ঢাল, বৃষ্টি, পানি জমার প্রবণতা, ভূতত্ত্ব, মাটি, ভূমি ব্যবহার, নদী ও ফাটলরেখা থেকে দূরত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোকে একত্র করে কম্পিউটারভিত্তিক মডেল তৈরি করেছেন।
গবেষণাটি দেখেছে, বর্তমান অবস্থায় সিডিএ এলাকার ৮০৯.১১ বর্গকিলোমিটার খুব কম ঝুঁকিতে, ১১৫.৩৫ বর্গকিলোমিটার কম ঝুঁকিতে, ৪৪.৭৫ বর্গকিলোমিটার মাঝারি ঝুঁকিতে, ৪৯.৯৩ বর্গকিলোমিটার উচ্চ ঝুঁকিতে এবং ৯৩.৭৮ বর্গকিলোমিটার অতি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ মোট এলাকার প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ভূমিধস ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষভাবে সীতাকুণ্ড, বায়েজিদ বোস্তামী ও হাটহাজারীর বড় অংশ অতি উচ্চ ঝুঁকিতে পড়েছে। খুরশী বা খুলশীর মতো নগর-সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাও বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব এলাকা মূলত খাড়া ঢাল, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বৃষ্টি এবং মানুষের তৈরি চাপের কারণে বেশি ঝুঁকিতে।

মূল গবেষণাপত্রের লিঙ্কঃ https://doi.org/10.1016/j.geogeo.2025.100354
এই গবেষণার সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হলো ভূমিধসের ক্ষেত্রে বৃষ্টি ও উচ্চতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এরপর এসেছে ভূমির অবস্থান, ঢাল, পানি জমার প্রবণতা এবং ফাটলরেখা থেকে দূরত্ব। সহজ ভাষায়, পাহাড়ি উচ্চতা, খাড়া ঢাল আর ভারী বৃষ্টি একসঙ্গে হলে বিপদ দ্রুত বাড়ে। ভবিষ্যৎ চিত্রও নিশ্চিন্ত করার মতো কিছু নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিতে অতি উচ্চ ভূমিধ্বস ঝুঁকির এলাকা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। অতি উচ্চ ঝুঁকির এলাকা ৮.৩২ শতাংশ থেকে ৮.৭৯ শতাংশে উঠতে পারে; সর্বনিম্ন জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব বিবেচনায় তা ৮.৪০ শতাংশ থেকে ৮.৫০ শতাংশে যেতে পারে। সংখ্যায় এই বৃদ্ধি খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ, দ্রুত বদলে যাওয়া নগর-সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চল। ঝুঁকির সামান্য স্থানিক বৃদ্ধি মানে বাস্তবে আরও বেশি মানুষ, ঘরবাড়ি, রাস্তা ও স্কুল বিপদের মুখে পড়তে পারে।
গবেষণা আসলে কী সতর্ক করেছিল ?
এই দুই গবেষণা কোনো নির্দিষ্ট দিনের ভূমিধ্বসের পূর্বাভাস দেয়নি। তারা বলেনি, কোন দিনে কোন পাহাড় ভেঙে পড়বে। কিন্তু তারা আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু করেছে, তারা দেখিয়েছেন, কোন অঞ্চলগুলো আগে থেকেই বিপজ্জনক অবস্থায় আছে, কোন কারণগুলো সেই বিপদ বাড়াচ্ছে, আর ভবিষ্যতে জলবায়ু ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন সেই ঝুঁকিকে কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই জায়গাতেই গবেষণাগুলো আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। যখন ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যখন টানা বর্ষণে শহর ডুবে যায়, যখন পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী শিশুদের মৃত্যু হয়, তখন আমরা বুঝতে পারি, ঝুঁকির মানচিত্র কাগজে আটকে থাকলে চলবে না। সেই মানচিত্রকে নগর পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পাহাড় রক্ষা ও মানুষের পুনর্বাসনের কাজে ব্যবহার করতে হবে।
দুটি গবেষণাই দেখিয়েছে, চট্টগ্রামের বিপদ শুধু “প্রকৃতি” নয়। প্রকৃতি এখানে মঞ্চ তৈরি করেছে পাহাড়, ঢাল, বৃষ্টি, ভঙ্গুর মাটি। কিন্তু মানুষের কাজ সেই মঞ্চকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে, পাহাড় কাটা, গাছ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি, রাস্তা নির্মাণ, অপরিকল্পিত শহর বৃদ্ধি। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, যা ভারী বৃষ্টির ঘটনাকে আরও তীব্র করতে পারে।
ভবিষ্যতে কী আসছে ?
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানো সহজ, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্ক করা কঠিন। এই গবেষণাগুলো ভয় দেখায় না; বরং বলে, এখনই পরিকল্পনা বদলালে ক্ষতি কমানো সম্ভব। মাটি ক্ষয়ের গবেষণাটি বলছে, বেশি তাপমাত্রা, তীব্র বৃষ্টি এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন একসঙ্গে মাটি ক্ষয় বাড়াতে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে গাছের চাপ বাড়ে, মাটির গঠন দুর্বল হতে পারে, আর বৃষ্টির আঘাতে মাটি দ্রুত সরতে পারে। একই সঙ্গে গাছপালাযুক্ত জমি যদি বসতি, রাস্তা বা চাষের জমিতে বদলে যায়, তাহলে মাটির প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে যায়। ভূমিধ্বসের গবেষণাটি বলছে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন এলাকার কিছু অংশ আগে থেকেই উচ্চ ঝুঁকিতে। ভবিষ্যতে অতি উচ্চ ঝুঁকির এলাকা বাড়ার ইঙ্গিত আছে, বিশেষ করে বেশি নির্গমনের পথে। তাই ভবিষ্যতের বিপদ শুধু বৃষ্টির পরিমাণে নয়; বিপদ হলো, বৃষ্টি কোথায় পড়ছে, সেই জায়গার ঢাল কেমন, সেখানে গাছ আছে কি না, মানুষ বসবাস করছে কি না, পানি বের হওয়ার পথ আছে কি না, এবং সেই পাহাড় আগে থেকেই কাটা বা দুর্বল কি না।
এখন কী করা দরকার ?
প্রথম কাজ, ঝুঁকির মানচিত্রকে সরকারি কাজের কেন্দ্রে আনা। কোথায় উচ্চ ঝুঁকি, কোথায় অতি উচ্চ ঝুঁকি, এগুলো শুধু গবেষণাপত্রে থাকলে হবে না। সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একই মানচিত্র ধরে কাজ করতে হবে। দ্বিতীয় কাজ, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি চিহ্নিত করে নিরাপদ পুনর্বাসন। বর্ষা এলেই মাইকিং করে মানুষকে নামতে বলা জরুরি, কিন্তু সেটি স্থায়ী সমাধান নয়। মানুষ কেন পাহাড়ে থাকে, কোথায় যাবে, জীবিকা কী হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ভূমিধস ঝুঁকি কমবে না। তৃতীয় কাজ, পাহাড় কাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে নতুন বসতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে হবে না; নিয়ম ভাঙলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাহাড়ি ঢালে রাস্তা, ঘর, দেয়াল বা ড্রেন বানানোর আগে ভূমিধস ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থ কাজ, গাছপালা ফিরিয়ে আনা। গবেষণায় গাছপালার ঘনত্বকে মাটি ক্ষয় নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। গাছের শেকড় মাটিকে ধরে রাখে, বৃষ্টির আঘাত কমায় এবং ঢালের স্থিতিশীলতা বাড়ায়। তাই শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, জীবন বাঁচানোর জন্যও পাহাড়ি এলাকায় বন ও গাছ দরকার। পঞ্চম কাজ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। বৃষ্টি কত হলো, কতক্ষণ হলো, কোন পাহাড়ি ঢালে মাটি আগে থেকেই দুর্বল, কোথায় মানুষ থাকে, এই তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করে এলাকা-ভিত্তিক সতর্কতা দেওয়া দরকার। গবেষকরাও জনসচেতনতা, আগাম সতর্কতা, গাছ লাগানো, নিয়ন্ত্রিত নগর উন্নয়ন এবং মাটি স্থিতিশীল করার ব্যবস্থার কথা বলেছেন।
শেষ কথা
চট্টগ্রামের পাহাড় আমাদের শত্রু নয়। পাহাড় তার নিজস্ব নিয়মে দাঁড়িয়ে থাকে, পানি নেয়, পানি ছাড়ে, গাছ ধরে রাখে, মাটি ধরে রাখে। কিন্তু আমরা যখন পাহাড় কাটি, ঢালে ঘর বানাই, গাছ সরাই, পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ করি, তারপর অতিবৃষ্টিকে শুধু “প্রকৃতির দোষ” বলি তখন আমরা আসল কারণকে আড়াল করি। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও মৃত্যু আমাদের শোক দেয়। কিন্তু গবেষণা আমাদের আরেকটি জিনিস দেয়, আগাম বোঝার সুযোগ। বিজ্ঞান আগেই মানচিত্রে দেখিয়েছে কোথায় বিপদ জমছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই মানচিত্রকে পরিকল্পনায় পরিণত করব, নাকি প্রতিটি বর্ষায় নতুন মৃত্যুসংবাদ পড়ে আবার বলব “পাহাড় হঠাৎ ভেঙে পড়েছে”?
