ঢাকায় কেন হুটহাট বাড়ে কলেরার প্রকোপ?

ঢাকায় কলেরা নতুন কোনো রোগ নয়। বহু বছর ধরেই এই শহরে কলেরা দেখা যায়। কিন্তু সব বছর এক রকম যায় না। কোনো বছর রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে, আবার কোনো বছর হঠাৎ করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায়। ২০২২ সালে ঢাকায় এমনই বড় এক কলেরা-উত্থান দেখা যায়, যখন বহু রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসতে শুরু করেন।

বিশ্বখ্যাত ‘নেচার’ (Nature) পোর্টফোলিওর আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘কমিউনিকেশনস মেডিসিন’ (Communications Medicine)-এ সম্প্রতি একটি গবেষণা (আর্টিকেল ইন প্রেস হিসেবে) প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণা বলছে, ঢাকায় কলেরা বাড়ার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। আবহাওয়া, দূষিত পানি, নগরের বসবাসের পরিবেশ এবং কলেরার জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন, সব মিলিয়েই এই রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। সহজভাবে বললে, কলেরা শুধু একটি জীবাণুর গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে পানি, জলবায়ু, নগর জীবন ও জনস্বাস্থ্যের গল্প।

এই গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ ও বিদেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একদল বিজ্ঞানী। গবেষণাপত্রটির লেখকদের মধ্যে আছেন মো. মামুন মনির, মুনিরুল আলম, কিম্বারলি ডি. সিড, অ্যান্ড্রু ক্যামিলি, কার্লা মাভিয়ান, নিকোলাস থমসন এবং রিটা আর. কলওয়েল। গবেষণার মূল নেতৃত্ব দিয়েছে আইসিডিডিআর,বি (বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র)। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি; টাফটস ইউনিভার্সিটি; ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার উদীয়মান রোগজীবাণু গবেষণা কেন্দ্র; ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউট; লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের গবেষকেরা। তাই এটি শুধু হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা গণনার সাধারণ কোনো গবেষণা নয়; এখানে জনস্বাস্থ্য, জীবাণুবিজ্ঞান, জিনগত বিশ্লেষণ এবং আবহাওয়ার তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।

গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল: ঢাকায় কেন কিছু বছর কলেরা বেশি হয়, আর কিছু বছর কম থাকে? কলেরা ঢাকায় বহু বছর ধরে মৌসুমী রোগ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু বছরের পর বছর রোগীর সংখ্যা একই থাকে না। কোনো বছর রোগীর সংখ্যা কমে যায়, আবার কোনো বছর হঠাৎ করে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। গবেষকেরা জানতে চেয়েছেন, এই ওঠানামার পেছনে শুধু আবহাওয়া কাজ করে কি না, নাকি কলেরার জীবাণু ভিব্রিও কলেরির জিনগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে কোনো বছরে জীবাণুর একাধিক বংশধারা একসঙ্গে ছড়ানো, নতুন কোনো বংশধারার দেখা দেওয়া, অথবা আগের বছরের তুলনায় জীবাণুর ধরনে বড় পরিবর্তন, এসব ঘটনা কলেরা রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটিও তারা বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার কলেরা রোগীর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আইসিডিডিআর,বি-এর ঢাকা হাসপাতালের ডায়রিয়া রোগ নজরদারি ব্যবস্থা থেকে রোগীর তথ্য নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় হাসপাতালে আসা ডায়রিয়া রোগীদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের রোগের ধরন, বাসস্থান, পরিবেশগত তথ্য এবং কোন জীবাণু পাওয়া গেছে, এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রায় তিন দশকের এই দীর্ঘ সময়ের তথ্য গবেষণাটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। কারণ এতে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রাদুর্ভাব নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকায় কলেরার মৌসুমী ও বার্ষিক পরিবর্তন বোঝা গেছে। রোগীর তথ্যের পাশাপাশি একই সময়ের তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও বাতাসের আর্দ্রতার তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন বোঝার জন্য ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া ভিব্রিও কলেরি জীবাণুর ৪৫১টি নমুনার পূর্ণ জিনগত নকশা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে গবেষণাটি রোগী, আবহাওয়া এবং জীবাণুর পরিবর্তন এই তিনটি স্তরকে একসঙ্গে দেখেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে কলেরা বেশি দেখা গেছে। মিরপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুর, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, দক্ষিণখান ও বাড্ডার মতো এলাকাগুলো কিছু সময়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে। তবে গবেষণাটি শুধু কোনো একটি এলাকার গল্প নয়; এটি পুরো ঢাকা শহরের কলেরা পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদি চিত্র তুলে ধরেছে।

কেন এই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ?

কলেরা সাধারণত দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং বসবাসের পরিবেশ, সবকিছু মিলে কলেরার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার গরম, বৃষ্টি ও আর্দ্রতা কলেরার জীবাণুর পরিবেশে টিকে থাকা এবং ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। এই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি শুধু আবহাওয়ার দিকে তাকায়নি, গবেষকেরা দেখিয়েছেন, কলেরার জীবাণুও সময়ের সঙ্গে বদলায়। কোনো কোনো বছরে একাধিক বংশধারা একসঙ্গে ছড়ায়, আবার কোনো বছরে নতুন বা আগে কম দেখা যাওয়া ধরন সামনে আসে। এসব জিনগত পরিবর্তনও রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই কলেরা বুঝতে হলে শুধু “কতজন আক্রান্ত হলো” তা জানলেই হবে না; জীবাণুটি কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও নজরে রাখতে হবে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ঢাকায় কলেরা সারা বছর থাকলেও সাধারণত দুই সময়ে রোগীর সংখ্যা বেশি হয়। প্রথম সময়টি মার্চ থেকে মে, বর্ষার আগের গরম সময়। দ্বিতীয় সময়টি সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, বর্ষার পরের সময়। অর্থাৎ ঢাকার কলেরা পুরোপুরি এলোমেলো নয়; এর একটি মৌসুমি ছন্দ আছে। এই দুই সময়ের সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। আগের সপ্তাহে গড় তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে, বৃষ্টি বেশি হলে এবং বাতাসের আর্দ্রতা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে থাকলে কলেরা রোগীর সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে এর মানে এই নয় যে শুধু গরম বা বৃষ্টি হলেই কলেরা হবে। বরং এসব আবহাওয়া দূষিত পানি ও জীবাণুর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

পাশাপাশি দেখা গেছে, কলেরার জীবাণু ভিব্রিও কলেরি এক জায়গায় স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে এর ভিন্ন ভিন্ন বংশধারা দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো বছরে একাধিক ধরনের জীবাণু একসঙ্গে ছড়িয়েছে। আবার কোনো বছর নতুন বা আগে কম দেখা যাওয়া কোনো বংশধারা ফিরে এসেছে। যেসব বছরে জীবাণুর ধরনে এমন পরিবর্তন দেখা গেছে, সেসব বছরে কলেরা রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ার প্রবণতা ছিল। সহজভাবে বললে, শুধু আবহাওয়া নয়, জীবাণুর নিজের পরিবর্তনও কলেরা-উত্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: গবেষণাটি সম্পর্ক দেখিয়েছে, একক কোনো কারণকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করেনি। কলেরা বাড়ে অনেকগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করলে। আবহাওয়া, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, মানুষের চলাচল, বসবাসের পরিবেশ এবং জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন, সব মিলেই ঝুঁকির চিত্র তৈরি করে।

২০২২ সালের শিক্ষা

২০২২ সালের বড় কলেরা-উত্থান গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওই বছর ঢাকায় বড় আকারে রোগী বেড়ে যায়। গবেষকেরা মনে করছেন, সে সময় আবহাওয়ার অনুকূলতা, জীবাণুর ভিন্ন বংশধারার উপস্থিতি এবং আরও কিছু মানুষ ও পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে। এই ঘটনাটি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। কলেরা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু রোগী গোনা যথেষ্ট নয়। পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, আবহাওয়া, রোগীর অবস্থান এবং জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন—সবকিছুর ওপর একসঙ্গে নজর রাখতে হবে।

তবে, গবেষণায় দেখা যায়, ২০১০ সালের পর ঢাকার কিছু পুরোনো কলেরা-প্রবণ এলাকায় রোগীর সংখ্যা অনেক কমে যায়। মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও ডেমরার মতো কয়েকটি এলাকায় আগের তুলনায় কম রোগী দেখা যায়। এর পেছনে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, টিকা কার্যক্রম, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বসবাসের পরিবেশে উন্নতির ভূমিকা থাকতে পারে। তবে কমে যাওয়া মানেই ঝুঁকি শেষ হয়ে গেছে এমন নয়। ২০১৮, ২০১৯ এবং ২০২২ সালে আবার বড় উত্থান দেখা গেছে। অর্থাৎ কলেরা কখনো কমে গেলেও শহরকে প্রস্তুত থাকতে হয়। কারণ জীবাণু, আবহাওয়া ও নগর পরিবেশ বদলালে রোগের ঝুঁকিও বদলাতে পারে।

এখন কী করা দরকার?

ঢাকার মতো বড় শহরে কলেরা মোকাবিলার জন্য কয়েকটি কাজ জরুরি। প্রথমত, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কলেরার সঙ্গে পানির সম্পর্ক সরাসরি। তাই পানি নিরাপদ না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও রোগের ঝুঁকি থেকেই যায়। দ্বিতীয়ত, আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ সময় আগেই শনাক্ত করা দরকার। তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার পরিবর্তন যদি নিয়মিত নজরদারিতে রাখা যায়, তাহলে সম্ভাব্য কলেরা-উত্থানের আগে সতর্ক হওয়া সহজ হতে পারে। তৃতীয়ত, কলেরার জীবাণুর জিনগত নজরদারি বাড়াতে হবে। কোন বংশধারা ছড়াচ্ছে, নতুন কোনো ধরন দেখা দিচ্ছে কি না, বা আগের কোনো ধরন আবার ফিরে আসছে কি না এসব জানা গেলে প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করবে। চতুর্থত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি, জনসচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কলেরা দ্রুত শরীরের পানি কমিয়ে দিতে পারে, তাই সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া জীবন রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার কলেরা আমাদের মনে করিয়ে দেয় পরিবেশ বদলালে রোগের ধরনও বদলাতে পারে। আর সেই বদল বুঝতে হলে আমাদের শহর, পানি, আবহাওয়া এবং অদৃশ্য জীবাণুর পরিবর্তন সবকিছুর গল্প একসঙ্গে পড়তে হবে।

মূল গবেষণাপত্রটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

আরো দেখান
Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading