দুপুর হওয়ার আগেই কি ঘুমিয়ে পড়ছে গাছ ?

দুপুরের রোদ যখন সবচেয়ে তীব্র, তখনই কি গাছ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে? সহজ হিসাবে উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ হওয়ার কথা। আলো যত বেশি, সালোকসংশ্লেষণের সুযোগ তত বেশি। শিকড় থেকে পানি উঠে পাতায় পৌঁছাবে, পাতার সূক্ষ্ম রন্ধ্র খুলবে, আর সেই পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে পৃথিবীর বহু জায়গায় গাছ ঠিক উল্টো আচরণ করে।

গবেষণা বলছে, দুপুর হওয়ার আগেই তাদের পানি ছাড়ার হার সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছে যায়। এরপর রোদ আরও বাড়লেও পানি ছাড়ার গতি কমতে শুরু করে। যেন দিনের সবচেয়ে গরম সময় আসার আগেই গাছ নিজের কাজের গতি কমিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই ছোট ছোট এলাকায় এমন ঘটনা দেখেছেন। কিন্তু এবার মহাকাশ থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পৃথিবীর বহু অঞ্চলে গাছপালার মধ্যে এই ‘দুপুরের ধীরগতি’ দেখা যায়। আর খরা ও তাপপ্রবাহের সময় ঘটনাটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

৭ আগস্ট ২০২৬ এ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয় গবেষণাটি, করেছেন জিংই বু, জিংফেং শিয়াও, জশুয়া বি ফিশার এবং ইছি লুও। জিংই বু ও জিংফেং শিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবী, মহাসাগর ও মহাকাশবিষয়ক গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক। জশুয়া বি ফিশার যুক্ত ছিলেন চ্যাপম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। একই সঙ্গে তিনি হাইড্রোস্যাট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ইছি লুও যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা ও শস্যবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক। গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজাঃ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গাছপালা দিনের কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করে এবং খরা বা তীব্র গরমের সময় সেই সময়সূচি বদলে যায় কি না।

তাহলে দেখা যাক কীভাবে তাঁরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন।বিজ্ঞান বলে, গাছের পাতায় থাকে অসংখ্য ক্ষুদ্র রন্ধ্র। এই রন্ধ্র দিয়েই গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নেয়। সূর্যের আলো ব্যবহার করে সেই কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে গাছ খাদ্য তৈরি করে। অর্থাৎ, পাতার দরজা খোলা আর বন্ধ হবার মধ্যেই আছে গাছের খাবার তৈরির কৌশল। কিন্তু এই দরজা খোলা রাখার একটি মূল্য আছে। রন্ধ্র খোলা থাকলে পাতার ভেতরের পানিও বাষ্প হয়ে বাইরে চলে যায়। ফলে গাছকে প্রতিদিন একটি কঠিন হিসাব মেলাতে হয়, খাদ্য তৈরির জন্য রন্ধ্র খোলা রাখবে, নাকি পানি বাঁচাতে তা বন্ধ করবে?

সকালের দিকে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহজ থাকে। বাতাস কিছুটা ঠান্ডা, মাটি থেকেও পানি পাওয়া যায়। কিন্তু দুপুর যত এগিয়ে আসে, তাপমাত্রা বাড়ে, বাতাস আরও শুষ্ক হয়। তখন বাতাস পাতার কাছ থেকে আরও বেশি পানি টেনে নিতে চায়। একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন শিকড় যে গতিতে পানি সরবরাহ করতে পারে, পাতার পানি হারানোর গতি তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। তখন গাছ পাতার রন্ধ্র আংশিক বন্ধ করে দেয়। এতে পানি কম হারায়। কিন্তু একই সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণও কমে যায়। ফলে আলো প্রচুর থাকলেও সালোকসংশ্লেষণের হার কমে যেতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, এই দুপুরের ধীরগতি সব সময় গাছের কোনো পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি গাছের পানি পরিবহনব্যবস্থার স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার ফল। গাছ যে পরিমাণ পানি পাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পানি হারাতে শুরু করলে আগের গতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

দুপুরে গাছের পানি ব্যবহার কমে যাওয়ার ঘটনা মাঠপর্যায়ের গবেষণায় আগেও ধরা পড়েছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল পরিসরে। মাটিতে বসানো একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র তার আশপাশের অল্প জায়গার তথ্য দিতে পারে। পৃথিবীর সব জায়গায় এমন কেন্দ্রও নেই। আবার প্রচলিত অনেক উপগ্রহ দিনে কোনো একটি জায়গার ওপর দিয়ে একবার বা দুবার যায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের অবস্থা জানা গেলেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছের আচরণ কীভাবে বদলাচ্ছে, তা বোঝা কঠিন। এই গবেষণায় সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রে থাকা নাসার ইকোস্ট্রেস নামের একটি তাপ-পর্যবেক্ষণযন্ত্রের তথ্য। আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রের কক্ষপথের কারণে এই যন্ত্র একই এলাকার তথ্য দিনের বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করতে পারে। এর স্থানিক সূক্ষ্মতা প্রায় সত্তর মিটার। অর্থাৎ তুলনামূলক ছোট কৃষিক্ষেত্র বা পাশাপাশি থাকা ভূমির অংশগুলোর মধ্যেও পার্থক্য ধরা সম্ভব।

ইকোস্ট্রেস পৃথিবীর প্রতিটি জায়গার প্রতি ঘণ্টার ছবি তোলে না। ফলে সরাসরি পর্যবেক্ষণের মধ্যে ফাঁক থাকে। সেই ফাঁক পূরণ করতেই গবেষকেরা মডেলিং বা মেশিন-লার্নিং এর সাহায্য নিয়েছেন। তাঁরা ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইকোস্ট্রেসের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আরও কয়েক ধরনের পরিবেশগত তথ্য মিলিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল বাতাসের তাপমাত্রা, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, সূর্য থেকে আসা বিকিরণ, মাটির গভীর স্তরে পানির পরিমাণ, বাতাসের শুষ্কতা এবং উদ্ভিদের সবুজত্বের তথ্য। এই সব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে তাঁরা পৃথিবীর স্থলভাগের জন্য ঘণ্টাভিত্তিক পানি হারানোর একটি ধারাবাহিক চিত্র তৈরি করেন। তবে হিসাব তৈরি করলেই তো হলো না। সেটি বাস্তবের সঙ্গে কতটা মিলছে, তাও পরীক্ষা করতে হবে। তাই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা ১৯৪টি ভূমি-পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের সরাসরি পরিমাপের সঙ্গে নিজেদের হিসাব মিলিয়ে দেখেছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী হিসাব সংশোধনও করেছেন। অর্থাৎ গবেষণাটি শুধু মহাকাশ থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; মাটির কাছ থেকে পাওয়া সরাসরি পরিমাপ দিয়েও তা যাচাই করা হয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দিনের কোন সময়ে উদ্ভিদ ও মাটি থেকে পানি বাষ্প হয়ে বের হওয়ার হার সর্বোচ্চ হয়, তার বৈশ্বিক চিত্র। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গাছের সবচেয়ে সক্রিয় বৃদ্ধির মৌসুমে এবং শুষ্ক এলাকায় এই সর্বোচ্চ সময় দুপুরের আগেই সরে আসতে দেখা যায়। গবেষকেরা এটিকে উদ্ভিদের পানির চাপ ও দুপুরের ধীরগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। উৎসঃ বু ও সহগবেষক, নেচার কমিউনিকেশনস (২০২৬)। মূল চিত্রের বাংলা অভিযোজিত সংস্করণ। ক্রিয়েটিভ কমন্স অ্যাট্রিবিউশন ৪.০ আন্তর্জাতিক লাইসেন্স (সিসি বাই ৪.০)। চিত্রের ইংরেজি লেখা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

এই গবেষণায় শুধু একটি গাছ কত পানি হারাচ্ছে, তা আলাদা করে মাপা হয়নি। বরং একটি এলাকায় উদ্ভিদ ও মাটি মিলিয়ে মোট কত পানি বাষ্প হয়ে বাতাসে যাচ্ছে, সেটি দেখা হয়েছে। এরপর বিজ্ঞানীরা খুঁজেছেন দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়, কখন এই পানি বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার হার সর্বোচ্চ হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় দিনের তাপ ও সৌরশক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই হারও বাড়তে থাকার কথা। কিন্তু যদি দেখা যায়, পানি হারানোর সর্বোচ্চ সময় দুপুরে না হয়ে তার আগেই ঘটে যাচ্ছে, তাহলে বোঝা যায় দিনের পরের অংশে কোনো কিছু গাছের স্বাভাবিক কাজকে আটকে দিচ্ছে। সেখানেই ধরা পড়ে দুপুরের ধীরগতি বা গাছেদের ঝিমিয়ে পড়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে এই ঘটনা ঘটে না। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গাছের সবচেয়ে সক্রিয় বৃদ্ধির সময় সাধারণত গ্রীষ্মকাল। এই সময়েই দুপুরের ধীরগতি বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে উষ্ণমণ্ডলের যেসব অঞ্চলে পানির ঘাটতি থাকে, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে এই ঘটনা বেশি প্রকট। বিশেষ করে শুষ্ক এলাকায় গাছের সর্বোচ্চ পানি ব্যবহারের সময় সকালের দিকে বেশি সরে যেতে দেখা গেছে। অনেক জায়গায় এই সময় দুপুরের তুলনায় আধঘণ্টারও বেশি এগিয়ে এসেছে।

একজন দৌড়বিদের কথা ভাবা যেতে পারে। তার সবচেয়ে দ্রুত দৌড়ানোর কথা দুপুরে। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের আশঙ্কায় সে সকালেই সর্বোচ্চ গতি তুলে ফেলল। এরপর শরীর বাঁচাতে ধীরে চলতে শুরু করল। গাছের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা এমন। খরার সময় এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষকেরা স্বাভাবিক সময়ের সঙ্গে খরার সময় তুলনা করে দেখেছেন, উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় সর্বোচ্চ পানি ব্যবহারের সময় আরও আগে সরে গেছে। সাধারণভাবে এই পরিবর্তন ছিল প্রায় আধঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা। কিছু স্থানীয় চরম পরিস্থিতিতে তা প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাপপ্রবাহেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে খরার তুলনায় তাপপ্রবাহের প্রভাব কিছুটা কম বিস্তৃত এবং অঞ্চলভেদে বেশি বিচ্ছিন্ন ছিল। তার মানে, গাছ শুধু কত পানি ব্যবহার করছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কখন ব্যবহার করছে, সেটিও তার চাপের অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এরপর জানতে চেয়েছেন, খরা বা তাপপ্রবাহের সময় কোন পরিবেশগত কারণ গাছের এই সময়সূচি সবচেয়ে বেশি বদলে দিচ্ছে। খরার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাতাসের শুষ্কতা। বাতাস যত গরম ও শুষ্ক হয়, পাতার ভেতর ও বাইরের আর্দ্রতার পার্থক্য তত বাড়ে। তখন পাতার ভেতরের পানি আরও দ্রুত বাইরে যেতে চায়। মাটিতেও যদি পানি কম থাকে, তাহলে সমস্যা আরও বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, খরার সময় বাতাসের শুষ্কতা সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হলেও মাটিতে পানির পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাপপ্রবাহের সময় বাতাসের শুষ্কতার পাশাপাশি তীব্র সৌর বিকিরণের প্রভাবও বেড়ে যায়।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক, দক্ষিণ-পশ্চিম উত্তর আমেরিকায় ২০২০ সালের খরার ঘটনাটি গবেষকেরা আলাদাভাবে অনুসরণ করেছেন। সেখানে বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। এরপর, এপ্রিলের দিকে খরা বাড়তে শুরু করলে গাছের সর্বোচ্চ পানি ব্যবহারের সময়ও ধীরে ধীরে সকালের দিকে সরে যায়। জুন ও জুলাইয়ে খরা যখন সবচেয়ে তীব্র, অনেক এলাকায় সর্বোচ্চ পানি হারানোর সময় নেমে আসে প্রায় সকাল সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে। এরপর খরা কমতে থাকলে গাছের দৈনিক ছন্দও ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে অনেক জায়গায় আগের ছন্দ ফিরে আসে। নভেম্বর নাগাদ এলাকার চিত্র আবার অনেকটাই মার্চের অবস্থার মতো হয়ে যায়। অর্থাৎ দুপুরের এই ধীরগতি দিয়ে শুধু খরা আছে কি নেই তা নয়, খরা কতটা তীব্র হচ্ছে এবং পরে গাছ কতটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তারও ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

মিসরের নীল নদের বদ্বীপে একটি কৃষি অঞ্চলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পানি বাষ্প হয়ে বের হওয়ার হারের পরিবর্তন। একই এলাকার পাশাপাশি থাকা ক্ষেতেও দিনের বিভিন্ন সময়ে পানির ব্যবহারে বড় পার্থক্য দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এমন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ থেকে কোন জমির ফসল পানির সংকটে পড়ছে এবং কোথায় সেচের প্রয়োজন হতে পারে, তার ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব। উৎসঃ বু ও সহগবেষক, নেচার কমিউনিকেশনস (২০২৬)। মূল চিত্রের বাংলা অভিযোজিত সংস্করণ। ক্রিয়েটিভ কমন্স অ্যাট্রিবিউশন ৪.০ আন্তর্জাতিক লাইসেন্স (সিসি বাই ৪.০)। চিত্রের ইংরেজি লেখা বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

গবেষণাটির সবচেয়ে ব্যবহারিক দিকগুলোর একটি হলো কৃষি। মিসরের নীল নদের বদ্বীপের কৃষিজমিতে গবেষকেরা প্রায় সত্তর মিটার সূক্ষ্মতায় দিনের বিভিন্ন সময়ের পানি ব্যবহারের মানচিত্র তৈরি করেছেন। একই এলাকার পাশাপাশি থাকা ক্ষেতগুলোর মধ্যেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। দুপুরের কাছাকাছি কোনো কোনো ক্ষেত থেকে প্রচুর পানি বাষ্প হয়ে বের হচ্ছিল, আবার কোনো কোনো ক্ষেতের হার ছিল অনেক কম। গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য থেকে কোন ক্ষেতের ফসল পানির সংকটে পড়ছে এবং কোথায় সেচের প্রয়োজন হতে পারে, তার ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রচলিত খরা-পরিমাপের অনেক পদ্ধতি মূলত বৃষ্টি কমেছে কি না, মাটি কতটা শুকিয়েছে বা একটি অঞ্চলে সামগ্রিক পানির ঘাটতি কতটা সেগুলো বোঝায়। কিন্তু একটি গাছ সেই খরাকে আসলে কতটা ‘অনুভব’ করছে, তা সব সময় সরাসরি বোঝা যায় না। একই জায়গায় নিয়মিত গাছের দৈনিক পানি ব্যবহারের সময়সূচি দেখা গেলে গাছের ওপর চাপ বড় আকারে চোখে পড়ার আগেই কিছু সতর্কসংকেত পাওয়া যেতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

তবে বিষয়টিকে খুব সরল করে দেখাও ঠিক হবে না। সব গাছ একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। গাছের প্রজাতি, শিকড়ের গভীরতা, পাতার গঠন এবং একটি অঞ্চলে কী ধরনের উদ্ভিদ বেশি, এসব কারণেও দুপুরের ধীরগতির সময় ও তীব্রতা বদলাতে পারে।

গাছ যখন পাতার রন্ধ্র বন্ধ করে, তখন পানি কম হারায়। কিন্তু এর বিনিময়ে তাকে মূল্যও দিতে হয়। রন্ধ্র বন্ধ হলে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ কমে যায়। ফলে প্রচুর আলো থাকা সত্ত্বেও সালোকসংশ্লেষণ কমে যেতে পারে। এমন অবস্থা যদি বারবার ঘটে বা দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তাহলে গাছের বৃদ্ধি কমতে পারে। একই সঙ্গে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু গাছেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গাছ ও মাটি থেকে পানি বাষ্প হয়ে বের হওয়ার সময় আশপাশের পরিবেশ কিছুটা ঠান্ডা হয়। কিন্তু গাছ পানি বাঁচাতে এই প্রক্রিয়া কমিয়ে দিলে ভূমির কাছের বাতাস আরও গরম ও শুষ্ক হতে পারে। ফলে একটি দুষ্টচক্রও তৈরি হতে পারে। খরার কারণে গাছ পানি বাঁচাতে শুরু করল। পানি বাষ্প হয়ে বের হওয়া কমল। পরিবেশ আরও গরম ও শুষ্ক হলো। এতে গাছের ওপর চাপ আরও বাড়ল।

গবেষকেরা তাঁদের তৈরি হিসাবকে আরও দুটি বহুল ব্যবহৃত বৈশ্বিক তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দেখা গেছে, তুলনামূলকভাবে বড় এলাকার গড় তথ্য ব্যবহার করা এসব তথ্যভান্ডার দুপুরের এই পরিবর্তন ঠিকমতো ধরতে পারছে না, বিশেষ করে শুষ্ক অঞ্চলে। কোথাও কোথাও সর্বোচ্চ পানি ব্যবহারের সময় প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পরে দেখাচ্ছিল। এর একটি কারণ হতে পারে স্থানিক সূক্ষ্মতার অভাব। ধরা যাক, একটি বড় এলাকার মধ্যে বন, ঘাসভূমি, কৃষিজমি ও খালি মাটি রয়েছে। সবকিছুকে একসঙ্গে গড় করা হলে প্রতিটির আলাদা দৈনিক আচরণ মিশে যায়। ফলে গাছের আসল দুপুরের ধীরগতি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেক অঞ্চলে তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে একটি বন বা কৃষিজমি দিনে মোট কত পানি ব্যবহার করছে, শুধু সেটি জানলেই যথেষ্ট নাও হতে পারে। জানতে হবে, দিনের কোন সময়ে সেই পানি ব্যবহার হচ্ছে। কারণ গাছের মোট পানি ব্যবহার খুব বেশি না বদলালেও তার সময়সূচি বদলে যেতে পারে। আর সেই সময়সূচির পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে চাপের আগাম সংকেত।

গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি খরা পর্যবেক্ষণ, ফসলের পানির ঘাটতি শনাক্ত করা, সেচের সময় নির্ধারণ এবং পৃথিবীর পরিবেশব্যবস্থার ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়ে তৈরি হিসাব আরও উন্নত করতে কাজে লাগতে পারে।

আরো দেখান
Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading