কেন বাংলাদেশের নিজস্ব রাডারভিত্তিক ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ দরকার

বাংলাদেশের বড় দুর্যোগগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে: যখন পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ, তখন আকাশও সবচেয়ে বেশি মেঘাচ্ছন্ন থাকে। টানা বর্ষণে নদীর পানি বাড়ে, হাওর ও নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়, উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে, পাহাড়ে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়। অথচ ঠিক সেই সময় সাধারণ আলোকচিত্রভিত্তিক উপগ্রহের দৃষ্টিশক্তি মেঘের আড়ালে সীমিত হয়ে পড়ে। কেননা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু আগাম সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়। দুর্যোগের আগে কোথায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, দুর্যোগ চলাকালে কোন এলাকা পানির নিচে যাচ্ছে, কোন সড়ক বিচ্ছিন্ন হচ্ছে এবং দুর্যোগের পরে কোথায় কত ক্ষতি হয়েছে, এসব তথ্যও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে জানা প্রয়োজন। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই বাংলাদেশে তিনটি ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ এবং ভারী মৌসুমি বৃষ্টিজনিত আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধ্বসে আরও ১৩ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় ভূ-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, যা মেঘ, বৃষ্টি এবং রাতের অন্ধকারেও ভূমি, নদী, কৃষিজমি, উপকূল ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। ইউরোপীয় সেন্টিনেল-১-এর মতো রাডার বা এসএআর উপগ্রহ সেই সক্ষমতা দিতে পারে। তবে লক্ষ্য কেবল একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ হওয়া উচিত নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত মহাকাশ থেকে পাওয়া তথ্যকে জননিরাপত্তা, কৃষি, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ব্যবহারযোগ্য একটি স্থায়ী জাতীয় সেবায় পরিণত করা।
সাধারণ উপগ্রহের চেয়ে রাডার উপগ্রহ কেন আলাদা ?
সাধারণ আলোকচিত্রভিত্তিক ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহকে মহাকাশে স্থাপিত একটি ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ভূমির পরিষ্কার ছবি পেতে এ ধরনের উপগ্রহ সূর্যের আলো এবং তুলনামূলকভাবে মেঘমুক্ত আকাশের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাংলাদেশের বন্যা, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড় সাধারণত বর্ষাকালে ঘটে, যখন দীর্ঘ সময় আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে। রাডার উপগ্রহের কাজের ধরন ভিন্ন। এটি নিজের মাইক্রোতরঙ্গ সংকেত ভূমির দিকে পাঠায় এবং ভূমি থেকে ফিরে আসা প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করে চিত্র তৈরি করে। ফলে সূর্যের আলো প্রয়োজন হয় না এবং মেঘের মধ্য দিয়েও ভূমি পর্যবেক্ষণ করা যায়। সেন্টিনেল-১ প্রকল্পে ব্যবহৃত সি-ব্যান্ড রাডার দিন-রাত এবং প্রায় সব ধরনের আবহাওয়ায় ভূমির চিত্র সংগ্রহের জন্য পরিকল্পিত। বাংলাদেশের জন্য এই বৈশিষ্ট্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যে প্রযুক্তি স্বাভাবিক আবহাওয়ায় ভালো ছবি তোলে কিন্তু বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় কার্যত অন্ধ হয়ে যায়, সেটি জাতীয় দুর্যোগ পর্যবেক্ষণের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না।
রাডার ভূ-উপগ্রহ কি বৃষ্টি পরিমাপ করতে পারবে ?
বৃষ্টি মাপা এবং বৃষ্টির প্রভাব দেখা এক বিষয় নয়। সেন্টিনেল-১ ধরনের রাডার উপগ্রহকে সরাসরি ‘বৃষ্টিমাপক উপগ্রহ’ বলা সঠিক হবে না। এটি কোনো এলাকায় ঘণ্টায় ঠিক কত মিলিমিটার বৃষ্টি হচ্ছে, তা মাপার জন্য নির্মিত নয়। বৃষ্টিপাত নির্ণয়ের জন্য বিশেষ বৃষ্টিমাপক রাডার ও বিকিরণমাপক যন্ত্র, আবহাওয়া রাডার, ভূমিভিত্তিক বৃষ্টিমাপক কেন্দ্র এবং আবহাওয়া পূর্বাভাসের গাণিতিক মডেল প্রয়োজন। যেগুলো বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের আছে বলে আমার বিশ্বাস। এখানে, রাডারভিত্তিক ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহের প্রধান শক্তি হলো বৃষ্টির পরিণতি দেখা। কোথায় নতুন করে পানি উঠেছে, কোন বসতি বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোন কৃষিজমি ডুবে গেছে, কোথায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, নদী বা হাওরের পানি কত দূর ছড়িয়েছে এবং পাহাড়ি ভূমি অতিরিক্ত বৃষ্টিতে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে কি না, এসব পরিবর্তন রাডার চিত্রে শনাক্ত করা সম্ভব। অতএব, বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা হবে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা: বিশেষ বৃষ্টিমাপক উপগ্রহ ও আবহাওয়া রাডার জানাবে কত বৃষ্টি হয়েছে বা হতে পারে; নদীর পানির উচ্চতা মাপার কেন্দ্র জানাবে পানি কত দ্রুত বাড়ছে; আর রাডারভিত্তিক ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ দেখাবে সেই পানি ভূমি, কৃষি, বসতি ও অবকাঠামোর ওপর কী প্রভাব ফেলছে।
দুর্যোগে মহাকাশের তথ্য কীভাবে মাঠের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে ?
বন্যার সময় প্রশাসনের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, পানি কোথায় প্রবেশ করেছে, কত দূর ছড়িয়েছে এবং কোন জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্যোগের আগের ও পরের রাডার চিত্র তুলনা করে নতুন প্লাবিত এলাকা, বিচ্ছিন্ন জনপদ, পানিতে তলিয়ে যাওয়া কৃষিজমি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং বাঁধ বা পোল্ডারের সম্ভাব্য ভাঙন শনাক্ত করা যায়। এই তথ্য ব্যবহার করে কোন ইউনিয়নে আগে উদ্ধারকারী দল যাবে, কোথায় ত্রাণ পাঠাতে হবে, কোন পথ ব্যবহারযোগ্য এবং কোন আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব, সে বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। দুর্যোগের পর একই তথ্য ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব, পুনর্বাসন পরিকল্পনা, ফসলের ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মানচিত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। কয়েক বছরের ধারাবাহিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে কোন অঞ্চল বারবার প্লাবিত হচ্ছে, কোথায় নদীভাঙন দ্রুত হচ্ছে কিংবা কোন বাঁধ ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে—এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও বোঝা সম্ভব। তবে রাডার প্রযুক্তিকে সর্বশক্তিমান সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভবনের ছায়া ও বহুবার প্রতিফলনের কারণে বন্যার পানি শনাক্ত করা জটিল হতে পারে। ঘন বন বা জটিল পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতেও ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শুধু একটি রাডার চিত্র থেকে সব অবস্থায় পানির গভীরতা নির্ণয় করা যায় না। এ জন্য উচ্চতার মানচিত্র, নদীর পানির পরিমাপ, বৃষ্টির তথ্য, জলপ্রবাহের মডেল এবং মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণের সমন্বয় প্রয়োজন।
হতে পারে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় একটি নতুন তথ্যভিত্তি
বাংলাদেশের কৃষি পর্যবেক্ষণের বড় বাধা হলো বর্ষার মেঘ। আমন ধান রোপণ থেকে শুরু করে বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং ফসল কাটার সময় পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার মধ্যে পড়ে। ফলে শুধু আলোকচিত্রভিত্তিক উপগ্রহের ওপর নির্ভর করলে ফসলের ধারাবাহিক পরিবর্তনের বড় অংশ বাদ পড়ে যেতে পারে। রাডার উপগ্রহের মাধ্যমে ধানের জমিতে প্রাথমিক পানি, চারা রোপণ, গাছের বৃদ্ধি, জমির উপরিভাগের আর্দ্রতা এবং ফসল কাটার পর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। আলোকচিত্রভিত্তিক উপগ্রহ, আবহাওয়ার তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের নমুনার সঙ্গে এই তথ্য যুক্ত করলে কোন জেলায় কত জমিতে ফসল হয়েছে, কোথায় খরা বা জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং সম্ভাব্য উৎপাদন কত হতে পারে, সে বিষয়ে সময়োপযোগী ধারণা পাওয়া যাবে।
এর সরাসরি অর্থনৈতিক ব্যবহারও রয়েছে। বন্যায় কোন জমি কত দিন পানির নিচে ছিল, তা জানা গেলে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। কৃষিবিমা, সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে শুধু আবেদন বা আনুমানিক মাঠ জরিপের পরিবর্তে উপগ্রহভিত্তিক প্রমাণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং ভুল, বিলম্ব ও অনিয়ম কমবে। তবে একই রাডার প্রতিধ্বনি ভিন্ন ফসল, ভেজা মাটি, জমির রুক্ষতা কিংবা গাছের বৃদ্ধির কারণে বদলে যেতে পারে। তাই রাডারের তথ্যকে কৃষিবিদদের পর্যবেক্ষণ ও মাঠের নমুনা দিয়ে যাচাই করা অপরিহার্য। উপগ্রহ কৃষি কর্মকর্তার বিকল্প নয়; বরং তাঁর কাজকে দ্রুত, বিস্তৃত ও প্রমাণভিত্তিক করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
নদী, উপকূল, সুন্দরবন ও সমুদ্রের জন্যও একই অবকাঠামো
বাংলাদেশের নদী স্থির নয়। নদীর তীর সরে যায়, চর জাগে, পুরোনো বসতি বিলীন হয় এবং নতুন প্রবাহপথ তৈরি হয়। ধারাবাহিক রাডার চিত্র ব্যবহার করে নদীতীরের অবস্থান, চরের পরিবর্তন, ভাঙনের গতি এবং মৌসুমি জলসীমা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ শনাক্ত করে আগাম পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং নদীশাসন প্রকল্পের ফল মূল্যায়ন করা সম্ভব। উপকূলে একই প্রযুক্তি জলোচ্ছ্বাসের বিস্তার, বাঁধ ও পোল্ডারের অবস্থা, উপকূলরেখার পরিবর্তন, ম্যানগ্রোভ বন এবং ভূমি ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাওয়ার প্রবণতা পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। একই এলাকার বিভিন্ন সময়ের রাডার চিত্রের তরঙ্গগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করে ভূমি, সেতু, বাঁধ বা অন্যান্য অবকাঠামোর অতি ক্ষুদ্র স্থানচ্যুতিও নির্ণয় করা সম্ভব। সমুদ্রে রাডার উপগ্রহ জাহাজের অবস্থান, নৌপথ, সম্ভাব্য তেল নিঃসরণ এবং সন্দেহজনক সামুদ্রিক কার্যক্রম শনাক্ত করতে পারে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অবৈধ মাছ ধরা, সামুদ্রিক দূষণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি হতে পারে। সেন্টিনেল-১-এর নতুন প্রজন্মের উপগ্রহগুলোতে জাহাজের পরিচয় ও গতিপথের সংকেত গ্রহণের ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে, যা রাডারে শনাক্ত জাহাজের সঙ্গে ঘোষিত পরিচয় মিলিয়ে দেখতে সহায়তা করে।
ছবির সূক্ষ্মতা: কত ছোট বস্তু দেখা যাবে
উপগ্রহের সক্ষমতা শুধু ‘ছবি তুলতে পারে’ বলে বিচার করা যায় না। প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো স্থানিক বিভেদন, অর্থাৎ ছবিতে ভূমির কত ছোট অংশ আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়। ২০ মিটার স্থানিক বিভেদনের একটি চিত্রে বড় নদী, বিস্তৃত বন্যা, হাওর এবং বড় কৃষিজমি দেখা যাবে। কিন্তু সরু খাল, ছোট বাঁধভাঙন, কয়েকটি বসতবাড়ি কিংবা স্থানীয় সড়কের ক্ষতি আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ৩ থেকে ৫ মিটার বিভেদনের চিত্রে এসব ছোট বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে ভালো দেখা যায়।
সেন্টিনেল-১-এর বহুল ব্যবহৃত বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার প্রশস্ত এলাকা প্রায় ৫ মিটার বাই ২০ মিটার বিভেদনে দেখা যায়। আরও বিস্তৃত এলাকায় পর্যবেক্ষণ করলে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার প্রশস্ত অঞ্চল দেখা সম্ভব, কিন্তু তখন বিভেদন কমে প্রায় ২০ মিটার বাই ৪০ মিটার হয়। উপগ্রহটির রাডার অ্যান্টেনার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ মিটার এবং মোট ভর প্রায় ২ হাজার ১৮৫ কিলোগ্রাম, যা উচ্চক্ষমতার রাডার ব্যবস্থার প্রকৌশলগত জটিলতা নির্দেশ করে। এখানে একটি মৌলিক সমঝোতা রয়েছে: যত সূক্ষ্ম ছবি প্রয়োজন, সাধারণত একবারে দেখা এলাকার পরিমাণ তত কমে যায়; পাশাপাশি তথ্যের পরিমাণ, বিদ্যুতের চাহিদা, সংরক্ষণক্ষমতা এবং প্রক্রিয়াকরণ ব্যয় বাড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তাই একই উপগ্রহে অন্তত দুই ধরনের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োজন হতে পারে। একটি পদ্ধতি ১০ থেকে ২০ মিটার বিভেদনে দ্রুত বড় অঞ্চল দেখবে, জাতীয় বন্যা, কৃষি, নদী, উপকূল ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণের জন্য। অন্য পদ্ধতিতে নির্বাচিত এলাকায় ৩ থেকে ৫ মিটার বা তার কাছাকাছি বিভেদনের বিস্তারিত চিত্র নেওয়া হবে, বাঁধভাঙন, শহুরে জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, ভূমিধস এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য।
সময়ের সূক্ষ্মতা: নতুন ছবি কত ঘন ঘন আসবে
দ্বিতীয় মাপকাঠি হলো কালিক বিভেদন বা পুনরায় পর্যবেক্ষণের ব্যবধান, অর্থাৎ একই এলাকার নতুন চিত্র কত ঘন ঘন পাওয়া যায়। একটি উপগ্রহ আজ সুনামগঞ্জের ওপর দিয়ে চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে আকস্মিক বন্যা শুরু হলে, সেটি আবার একই এলাকা দেখার আগে বেশ কিছু সময় চলে যেতে পারে। তত দিনে বন্যার বিস্তার বদলে যেতে পারে, কোনো সড়ক ভেঙে যেতে পারে কিংবা পানি অন্য অঞ্চলে সরে যেতে পারে।
সেন্টিনেল-১ মূলত দুটি অভিন্ন উপগ্রহের সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পিত। একটি উপগ্রহের একই কক্ষপথ পুনরাবৃত্তির সময় প্রায় ১২ দিন; দুটি উপগ্রহ নির্ধারিত দূরত্বে থাকলে বিষুবরেখার কাছে তা প্রায় ছয় দিনে নেমে আসে। বাংলাদেশের অক্ষাংশ, পর্যবেক্ষণের দিক এবং নির্দিষ্ট কাজের সময়সূচির কারণে বাস্তবে কোনো কোনো এলাকায় আরও ঘন পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে একই দিক ও একই কক্ষপথের তুলনাযোগ্য চিত্রের জন্য পরিকল্পিত পুনরাবৃত্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু উপগ্রহ ফিরে আসার সময় বিবেচনা করলেই হবে না। ছবি তোলার পর কত দ্রুত তা দেশের ভূ-গ্রহণকেন্দ্রে পৌঁছাবে, কত দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ হবে এবং কত সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসন বা উদ্ধারকারী সংস্থা ব্যবহারযোগ্য মানচিত্র পাবে, সেটিই কার্যত পুরো সেবার সময়গত মান নির্ধারণ করবে। বন্যার মানচিত্র যদি পাঁচ দিন পরে পাওয়া যায়, তাহলে সেটি গবেষণায় মূল্যবান হলেও জরুরি উদ্ধারে সীমিত কাজে আসবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত জরুরি তথ্য গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক বন্যা, ক্ষয়ক্ষতি বা বিচ্ছিন্নতার মানচিত্র তৈরি করা।

একটি নয়, দুটি উপগ্রহ কেন বেশি কার্যকর
একটি উপগ্রহ দিয়ে প্রযুক্তি পরীক্ষা এবং প্রাথমিক সেবা শুরু করা যায়। কিন্তু জাতীয় দুর্যোগ ও কৃষি পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য একটি মাত্র উপগ্রহের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। দুটি অভিন্ন উপগ্রহকে একই কক্ষপথে পরিকল্পিত দূরত্বে স্থাপন করা হলে নতুন চিত্র পাওয়ার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। একটি উপগ্রহ উপকূল অতিক্রম করার পর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে দ্বিতীয় উপগ্রহ তুলনামূলক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কৃষিক্ষেত্রেও ধান রোপণ, জমিতে পানি রাখা, ফসলের বৃদ্ধি এবং কাটার মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল পর্যায়গুলো বেশি ঘন ঘন ধরা সম্ভব হয়। দ্বিতীয় সুবিধা হলো সেবার ধারাবাহিকতা। মহাকাশযানে বিদ্যুৎব্যবস্থার ব্যর্থতা, যোগাযোগ সমস্যা, যন্ত্রের ত্রুটি বা মহাকাশের ধ্বংসাবশেষের আঘাত ঘটতে পারে। একটি মাত্র উপগ্রহ অকেজো হলে পুরো জাতীয় সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দুটি উপগ্রহ থাকলে অন্তত সীমিত পর্যায়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
দুটি উপগ্রহকে ভিন্ন পর্যবেক্ষণ অবস্থানে পরিচালনা করলে একই এলাকা পূর্বমুখী ও পশ্চিমমুখী কক্ষপথ থেকে দেখা যায়। রাডার যেহেতু ভূমিকে পাশ থেকে পর্যবেক্ষণ করে, তাই ভিন্ন দিকের চিত্র পাহাড়, শহর, বাঁধ ও নদীতীরের পরিবর্তন বুঝতে অতিরিক্ত তথ্য দেয়। ভূমি দেবে যাওয়া বা অবকাঠামোর স্থানচ্যুতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক ও ঘন রাডার চিত্র বিশেষ মূল্যবান। তবে দুটি উপগ্রহ থাকলেই সব ধরনের নতুন ছবি পাওয়ার ব্যবধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্ধেক হবে না। কক্ষপথের উচ্চতা, দুটি উপগ্রহের দূরত্ব, রাডারের পর্যবেক্ষণদিক এবং কোন এলাকা কতবার অগ্রাধিকার পাবে, এসব বিষয় শুরুতেই পরিকল্পনা করতে হবে।
রাডার উপগ্রহ বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কাজ করে। বাংলাদেশের জন্য সি-ব্যান্ড ও এল-ব্যান্ড বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে এগুলোকে সরাসরি ভালো ও খারাপের তুলনা হিসেবে দেখা উচিত নয়; দুটি তরঙ্গ ভিন্ন ধরনের ভূ-পৃষ্ঠ ও উদ্ভিদ কাঠামোর প্রতি ভিন্নভাবে সাড়া দেয়। সেন্টিনেল-১-এর সি-ব্যান্ড তরঙ্গদৈর্ঘ্য কয়েক সেন্টিমিটার। এটি খোলা পানির বিস্তার, বন্যা, জলাবদ্ধতা, নদী, উপকূল, কৃষিজমির উপরিভাগ, কম থেকে মাঝারি ঘনত্বের ফসল, নগর এলাকা এবং সমুদ্র পর্যবেক্ষণে কার্যকর। বিস্তৃত এলাকা তুলনামূলক সূক্ষ্মভাবে দেখার প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সি-ব্যান্ডের ব্যবহার ব্যাপক।
এল-ব্যান্ডের তরঙ্গ অনেক দীর্ঘ, সাধারণত প্রায় ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার। দীর্ঘ তরঙ্গ গাছের পাতা ও ছোট ডালের স্তরের মধ্যে সি-ব্যান্ডের তুলনায় গভীরভাবে প্রবেশ করে বড় ডাল, কাণ্ড এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমির কাছাকাছি অংশের সঙ্গে বেশি ক্রিয়া করতে পারে। তাই বন ও গাছের জৈবভর, সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ অঞ্চল, গাছপালাযুক্ত জলাভূমি, উদ্ভিদের নিচে থাকা পানি এবং ভূমির দীর্ঘমেয়াদি স্থানচ্যুতি পর্যবেক্ষণে এল-ব্যান্ড বিশেষ উপকারী। তবে এল-ব্যান্ডকে এমন কোনো রশ্মি ভাবা ঠিক নয়, যা ঘন বন বা মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত সবকিছু পরিষ্কার দেখবে। এর কার্যকারিতা উদ্ভিদের ঘনত্ব, মাটির আর্দ্রতা, ভূমির রুক্ষতা, রাডারের পতনকোণ এবং সংকেতের মেরুকরণের ওপর নির্ভর করে।
দুই ব্যান্ডের সম্মিলিত ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য বিশেষ মূল্যবান হতে পারে। সি-ব্যান্ড খোলা পানি, ফসলের উপরিভাগ এবং নগর পরিবর্তন দ্রুত দেখবে; এল-ব্যান্ড ম্যানগ্রোভ, ঘন উদ্ভিদ, জলাভূমির নিচের পানি এবং বড় উদ্ভিদ কাঠামো সম্পর্কে পরিপূরক তথ্য দেবে। ফলে ভেজা মাটি, অগভীর পানি, ফসল এবং ঘন উদ্ভিদের মধ্যে ভুল শ্রেণিবিন্যাস কমানোর সুযোগ বাড়বে।
একই উপগ্রহে সি-ব্যান্ড ও এল-ব্যান্ড রাখা যাবে কি ?
একই ভূ-উপগ্রহে একাধিক তরঙ্গের রাডার রাখা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। নাসা ও ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ নিসার উপগ্রহে একই মহাকাশযানে এল-ব্যান্ড ও এস-ব্যান্ড রাডার রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পরিকল্পিতভাবে বহুতরঙ্গ রাডার ব্যবস্থা তৈরি করা যায়। নিসারের এল-ব্যান্ডের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার এবং এস-ব্যান্ডের প্রায় ৯ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার। একই উপগ্রহে সি-ব্যান্ড ও এল-ব্যান্ড রাখা হলে একই সময়ে একই এলাকার দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যাবে। বৃষ্টির পর ভূমির অবস্থা দ্রুত বদলালে এক দিন আগের সি-ব্যান্ড চিত্র এবং কয়েক দিন পরের এল-ব্যান্ড চিত্রের তুলনায় একই সময়ের যুগপৎ পর্যবেক্ষণ বেশি নির্ভরযোগ্য হবে। কৃষি, সুন্দরবন, হাওর এবং বনাচ্ছাদিত প্লাবনভূমির ক্ষেত্রে এই সমকালীন তথ্য বিশেষ উপকারী।
কিন্তু সুবিধার সঙ্গে প্রকৌশলগত মূল্যও রয়েছে। দুই ধরনের রাডারের জন্য পৃথক সংকেত উৎপাদন ও গ্রহণব্যবস্থা, উপযুক্ত অ্যান্টেনা, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ, তাপ নিয়ন্ত্রণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং দ্রুত তথ্য প্রেরণের সক্ষমতা প্রয়োজন। দুই ব্যান্ডের পারস্পরিক বৈদ্যুতিক হস্তক্ষেপ ঠেকানো, অ্যান্টেনার নকশা সমন্বয় এবং দীর্ঘ পরীক্ষাপ্রক্রিয়া প্রকল্পকে আরও জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে।একই উপগ্রহে দুই রাডারের আরেকটি ঝুঁকি হলো কেন্দ্রীয় ব্যর্থতা। মহাকাশযানটি নষ্ট হলে দুটি রাডার সক্ষমতাই একসঙ্গে হারিয়ে যাবে। তাই ‘এক উপগ্রহে দুই সেন্সর দিলে খরচ অর্ধেক হবে’ এমন সরল সিদ্ধান্ত প্রযুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের জন্য কোন বিন্যাসটি যুক্তিযুক্ত ?
বাংলাদেশের সামনে মোটামুটি তিনটি সম্ভাব্য বিন্যাস রয়েছে।
প্রথমটি হলো দুটি অভিন্ন সি-ব্যান্ড উপগ্রহ। এতে বন্যা, কৃষি, নদী, উপকূল, সমুদ্র ও নগর পর্যবেক্ষণের জন্য একই ধরনের তুলনাযোগ্য চিত্র বেশি ঘন ঘন পাওয়া যাবে। একটি উপগ্রহ নষ্ট হলেও অন্যটি সেবা চালু রাখতে পারবে। একই নকশা, সফটওয়্যার ও পরীক্ষা পদ্ধতি পুনর্ব্যবহারের কারণে দ্বিতীয় উপগ্রহের প্রান্তিক ব্যয়ও প্রথমটির তুলনায় কম হতে পারে।
দ্বিতীয়টি হলো একটি সি-ব্যান্ড এবং একটি এল-ব্যান্ড উপগ্রহ। এতে পর্যবেক্ষণের বৈচিত্র্য বাড়বে, একদিকে বন্যা ও কৃষি, অন্যদিকে বন, জলাভূমি ও ভূমির স্থানচ্যুতি। কিন্তু একই ব্যান্ডের ধারাবাহিক চিত্রের ব্যবধান কমবে না। কোনো একটি উপগ্রহ নষ্ট হলে সেই ব্যান্ডের পুরো জাতীয় সক্ষমতাই বন্ধ হয়ে যাবে।
তৃতীয়টি হলো দুটি উপগ্রহের প্রতিটিতেই সি-ব্যান্ড ও এল-ব্যান্ড রাডার রাখা। এটি সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও দ্রুত তথ্য দিতে পারে, কিন্তু নির্মাণব্যয়, ভর, বিদ্যুৎ চাহিদা, কারিগরি ঝুঁকি এবং উৎক্ষেপণের জটিলতাও সর্বোচ্চ হবে।
বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কর্মক্ষম ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে দুটি অভিন্ন সি-ব্যান্ড উপগ্রহের একটি উপগ্রহগুচ্ছ তৈরি করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এল-ব্যান্ড তথ্যের জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত মিশন ও অংশীদারত্ব ব্যবহার করা। পরবর্তী পর্যায়ে পৃথক এল-ব্যান্ড উপগ্রহ যুক্ত করা যেতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে নয়; দেশের প্রধান ব্যবহারক্ষেত্র, প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক লাভ এবং জীবনচক্রব্যাপী ব্যয়ের স্বাধীন সমীক্ষার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
তথ্য বিনা মূল্যে পাওয়া গেলে নিজস্ব উপগ্রহ কেন ?
ইউরোপীয় কোপার্নিকাস কর্মসূচির সেন্টিনেল তথ্য এখনই বাংলাদেশসহ বিশ্বের সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, ব্যবসা ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বিনা মূল্যে উন্মুক্ত। বাংলাদেশের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত এই বিদ্যমান তথ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। তবুও নিজস্ব উপগ্রহের যৌক্তিকতা কয়েকটি জায়গায় রয়েছে।
বিদেশি উপগ্রহ কখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাবে, কোন এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করবে এবং কোন পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করবে, তার ওপর বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। নিজস্ব ব্যবস্থায় ঘূর্ণিঝড়, বাঁধভাঙন, আকস্মিক বন্যা বা বড় শিল্পদুর্ঘটনার সময় নির্দিষ্ট এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হবে। যেটি আমরা গত জুলাই ৮ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি।
নিজস্ব ভূ-গ্রহণকেন্দ্র ও দ্রুত প্রক্রিয়াকরণব্যবস্থা থাকলে তথ্য সংগ্রহ থেকে ব্যবহারযোগ্য মানচিত্র তৈরির সময় কমানো যাবে। দেশের কৃষি, নদী, উপকূল ও শহরের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ সময়সূচি, বিভেদন এবং তথ্যপণ্যও নির্ধারণ করা যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তথ্যের ধারাবাহিকতা ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সীমান্ত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সেবা পুরোপুরি অন্য দেশের অগ্রাধিকার ও মিশনের স্থায়িত্বের ওপর নির্ভরশীল রাখা কৌশলগতভাবে দুর্বল অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে ‘নিজস্ব’ শব্দের অর্থ এই নয় যে প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে তৈরি করতে হবে। এর অর্থ হওয়া উচিত পর্যবেক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণের অধিকার, দেশে তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা, সফটওয়্যার ও তথ্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় প্রকৌশলী ও গবেষকদের অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যতে প্রযুক্তি উন্নয়নের জ্ঞানভিত্তি।
উৎক্ষেপণের দামই মোট প্রকল্পের খরচ নয়
উপগ্রহের খরচ নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই শুধু রকেট উৎক্ষেপণের মূল্য সামনে আসে। কিন্তু উৎক্ষেপণ পুরো প্রকল্পব্যয়ের একটি অংশমাত্র। স্পেসএক্সের প্রকাশিত রকেট উৎক্ষেপণমূল্য অনুযায়ী ৫০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত ছোট উপগ্রহ পাঠানোর প্রাথমিক মূল্য বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার; অতিরিক্ত ভরের জন্য প্রতি কিলোগ্রামে ৭ হাজার ডলার যোগ হয়। এটি ছোট উপগ্রহের জন্য রকেটে জায়গা কেনার একটি উদাহরণ, পূর্ণাঙ্গ রাডার মিশনের মোট মূল্য নয়।
সেন্টিনেল-১-এর মতো উপগ্রহের ভর দুই হাজার কিলোগ্রামের বেশি এবং এতে বড় রাডার অ্যান্টেনা, উচ্চক্ষমতার বিদ্যুৎব্যবস্থা ও দ্রুত তথ্যপ্রেরণ ব্যবস্থা রয়েছে। তাই ৫০ কিলোগ্রামের ছোট উপগ্রহের সহযাত্রী উৎক্ষেপণমূল্য দিয়ে সেন্টিনেল-১ ধরনের মিশনের ব্যয় অনুমান করা বিভ্রান্তিকর।
পাশাপাশি, মোট জীবনচক্রব্যয়ের মধ্যে থাকতে হবে উপগ্রহ ও রাডার নির্মাণ, অ্যান্টেনা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণ, মহাকাশ-উপযোগিতা পরীক্ষা, উৎক্ষেপণযানের সঙ্গে সংযোগ, বীমা, ভূ-নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, তথ্য গ্রহণ ও সংরক্ষণব্যবস্থা, সফটওয়্যার, তথ্য বিশ্লেষণ, জনবল প্রশিক্ষণ, কয়েক বছরের পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিস্থাপন।
বাংলাদেশ ছোট বা মাঝারি আকারের বিশেষায়িত রাডার উপগ্রহ বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু শুধু ভর কমানোর লক্ষ্য নিয়ে রাডারের ক্ষমতা, অ্যান্টেনার আকার, বিদ্যুৎ বা তথ্যপ্রেরণ সক্ষমতা কমিয়ে দিলে উপগ্রহটি সস্তা হলেও প্রয়োজনীয় সেবা দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
দুটি উপগ্রহের খরচ কি দ্বিগুণ হবে ?
দুটি উপগ্রহের নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ ব্যয় অবশ্যই একটির চেয়ে বেশি। কিন্তু পুরো কর্মসূচির মোট খরচ ঠিক দ্বিগুণ হওয়ার কথা নয়।
প্রথম উপগ্রহের জন্য তৈরি নকশা, সফটওয়্যার, পরীক্ষা পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, ভূ-গ্রহণকেন্দ্র, তথ্যভান্ডার এবং প্রশিক্ষিত জনবল দ্বিতীয় উপগ্রহের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়। একই নকশার দ্বিতীয় উপগ্রহ নির্মাণে নতুন গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজন তুলনামূলক কম হতে পারে। দুটি উপগ্রহ একই তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো ব্যবহার করবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় উপগ্রহ নতুন ছবি পাওয়ার ব্যবধান কমাবে, জরুরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ বাড়াবে এবং পুরো ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করবে। ফলে সিদ্ধান্তটি ‘একটির দাম বনাম দুটির দাম’ হিসেবে না দেখে ‘একটির সীমিত সেবা বনাম দুটির নির্ভরযোগ্য জাতীয় সেবা’ হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
খরচকে টেকসই উন্নয়নের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে
একটি রাডার উপগ্রহকে শুধু মহাকাশ গবেষণা বা জাতীয় মর্যাদার প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর ব্যয় অনেক বড় মনে হবে। কিন্তু দুর্যোগে প্রতিবছর যে প্রাণ, ফসল, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীলতা হারায়, তার সঙ্গে তুলনা করলে অর্থনৈতিক হিসাবটি ভিন্ন হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। জলবায়ুর পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের কৃষিজ মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর অর্থ এই নয় যে একটি উপগ্রহ পুরো ক্ষতি বন্ধ করে দেবে। কিন্তু উপগ্রহের তথ্য যদি দ্রুত ত্রাণ পরিচালনা করে, দুর্বল বাঁধ শনাক্ত করে, কৃষির ক্ষতি নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করে, ফসলের পূর্বাভাস উন্নত করে, নদীভাঙনের ঝুঁকি আগে চিহ্নিত করে, অবৈধ মাছ ধরা বা তেল নিঃসরণ শনাক্ত করে এবং বারবার মাঠ জরিপের ব্যয় কমায়, তাহলে মোট ক্ষতির সামান্য অংশ কমিয়েও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লাভ তৈরি হতে পারে।
উপগ্রহ কর্মসূচির অর্থনৈতিক মূল্যায়নে তাই একটি পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রয়োজন:
মোট অর্থনৈতিক উপকার = এড়ানো দুর্যোগক্ষতি + কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপরিকল্পনার লাভ + জরিপ ও প্রশাসনিক ব্যয় সাশ্রয় + অবকাঠামো রক্ষা + সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ + নতুন তথ্যভিত্তিক ব্যবসা ও কর্মসংস্থান।
এই উপকারের বিপরীতে রাখতে হবে নির্মাণ, উৎক্ষেপণ, নিয়ন্ত্রণ, তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিস্থাপনের পুরো জীবনচক্রব্যয়। সাত থেকে দশ বছরের সম্ভাব্য কার্যকাল ধরে ভবিষ্যৎ ব্যয় ও উপকারের বর্তমান অর্থমূল্য তুলনা করতে হবে।
এই কর্মসূচি খাদ্যনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগসহনশীল নগর, জলবায়ু অভিযোজন, শিল্প ও উদ্ভাবন, সমুদ্রসম্পদ এবং বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, একাধিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে একসঙ্গে অবদান রাখতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তব হবে তখনই, যখন তথ্য সরকারি দপ্তরের সংগ্রহশালায় আটকে না থেকে কৃষক, গবেষক, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং উদ্যোক্তাদের ব্যবহারযোগ্য সেবায় রূপ নেবে।
উপগ্রহের চেয়ে বড় বিষয় হলো জাতীয় তথ্যব্যবস্থা
মহাকাশে একটি যন্ত্র পাঠালেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাডার উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য জেলা প্রশাসক, কৃষি কর্মকর্তা বা উদ্ধারকারী দলের জন্য সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়। তথ্যকে সংশোধন, শ্রেণিবিন্যাস এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত-সহায়ক মানচিত্রে রূপান্তর করতে হয়। তাই জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য ভূ-গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, উচ্চক্ষমতার তথ্যসংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয় বন্যা ও ফসল মানচিত্র তৈরির ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত রাডার প্রকৌশলী, ভূ-তথ্যবিশেষজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ, পানিবিজ্ঞানী ও কৃষিবিজ্ঞানী।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের নির্দিষ্ট বিধি থাকতে হবে। কোন দুর্যোগে কে উপগ্রহকে নির্দেশনা দেবে, কে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করবে এবং কোন সময়সীমার মধ্যে মাঠপর্যায়ে মানচিত্র পৌঁছাবে, এসব আগেই নির্ধারিত না থাকলে ব্যয়বহুল উপগ্রহও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
নিরাপত্তাসংক্রান্ত সীমিত তথ্য ছাড়া পরিবেশ, কৃষি ও দুর্যোগবিষয়ক তথ্য উন্মুক্ত রাখাও জরুরি। উন্মুক্ত তথ্য দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নবীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, মানচিত্র নির্মাতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা উদ্যোক্তাদের নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ দেবে। উপগ্রহের অর্থনৈতিক মূল্য মূলত তখনই বাড়ে, যখন একই তথ্য বহু প্রতিষ্ঠান বহু কাজে ব্যবহার করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মত পথ
বাংলাদেশকে সরাসরি সেন্টিনেল-১-এর অনুরূপ বৃহৎ উপগ্রহ নির্মাণ দিয়ে শুরু করতে হবে এমন নয়। বরং ধাপে ধাপে সক্ষমতা তৈরি করাই অধিক বাস্তবসম্মত।
প্রথম ধাপে বর্তমানে বিনা মূল্যে পাওয়া সেন্টিনেল-১, আলোকচিত্রভিত্তিক সেন্টিনেল তথ্য, আন্তর্জাতিক বৃষ্টিমাপক উপগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত জাতীয় বন্যা, ফসল, নদীভাঙন ও উপকূল পর্যবেক্ষণ সেবা চালু করা দরকার। এতে দেশের প্রয়োজন, তথ্যের ঘাটতি এবং ব্যবহারকারীদের বাস্তব চাহিদা পরিষ্কার হবে।
দ্বিতীয় ধাপে একটি জাতীয় ভূ-পর্যবেক্ষণ তথ্য ও বিশ্লেষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। উপগ্রহ কেনার আগেই তথ্য গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
তৃতীয় ধাপে আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি পরীক্ষামূলক ছোট বা মাঝারি সি-ব্যান্ড রাডার উপগ্রহ নির্মাণ করা যেতে পারে। এই পর্যায়ে অ্যান্টেনা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ভূ-নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা যাচাই হবে। চুক্তিতে শুধু প্রস্তুত উপগ্রহ কেনা নয়; স্থানীয় প্রকৌশলীদের নকশা, সংযোজন, পরীক্ষা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং পরিচালনায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থ ধাপে পরীক্ষিত একই নকশার দুটি সি-ব্যান্ড উপগ্রহ নির্দিষ্ট দূরত্বে কক্ষপথে স্থাপন করে একটি কর্মক্ষম জাতীয় উপগ্রহগুচ্ছ গড়ে তোলা যেতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে সুন্দরবন, বন, জলাভূমি ও ভূমির স্থানচ্যুতি পর্যবেক্ষণের জন্য এল-ব্যান্ড সক্ষমতা যুক্ত করা যাবে। এভাবে বাংলাদেশ প্রথমে তথ্য ব্যবহারকারী, পরে সেবা নির্মাতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সহ-উন্নয়নকারী দেশে পরিণত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি উপগ্রহের নয়, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার
বাংলাদেশের জন্য রাডারভিত্তিক ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ কোনো প্রদর্শনীমূলক মহাকাশ প্রকল্প হওয়া উচিত নয়। এর সাফল্যের মাপকাঠি উৎক্ষেপণের সরাসরি সম্প্রচার, স্মারক ডাকটিকিট কিংবা উপগ্রহের নাম নয়। সাফল্য নির্ধারিত হবে তখন, যখন বন্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্লাবিত গ্রামের মানচিত্র তৈরি হবে; যখন একজন কৃষক দ্রুত ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন; যখন দুর্বল বাঁধ ভাঙার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত হবে; যখন নদীভাঙনের আগে একটি জনপদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা যাবে; যখন সুন্দরবন, উপকূল ও সমুদ্রের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষিত হবে; এবং যখন দেশীয় শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীরা শুধু বিদেশি তথ্যের ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি ও সেবার নির্মাতা হয়ে উঠবেন।
একটি উপগ্রহ বাংলাদেশকে মহাকাশে উপস্থিত করতে পারে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত দুটি উপগ্রহ দেশকে আরও ঘন, নির্ভরযোগ্য এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা দিতে পারে। সি-ব্যান্ড ও এল-ব্যান্ডের সমন্বিত ব্যবহার আবার ভূমির উপরিভাগের পাশাপাশি ফসল, বন, জলাভূমি এবং পরিবর্তনশীল বদ্বীপকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
লেখক: তাওহীদ হোসাইন
প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, EnvironmentMove.earth
গবেষক, কৃষি ও রিমোট সেন্সিং
লাইবনিজ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চ (ZALF)
মুইঞ্চেবার্গ, জার্মানি।
ই-মেইল: mdtawhid.hossain@zalf.de
EnvironmentMove@gmail.com
