কমিউনিটি সোলার ইকোসিস্টেম কী বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হতে পারে ?
ঘরে ঘরে সৌর প্যানেল, ফিডারভিত্তিক যৌথ সঞ্চয় ও স্মার্ট মাইক্রোগ্রিড,হতে পারে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়ার বাস্তব পথ, কিন্তু কিভাবে ?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো কাগজে উৎপাদনক্ষমতা আছে, কিন্তু সব কেন্দ্র সব সময় চালানোর মতো সাশ্রয়ী ও নিশ্চিন্ত জ্বালানি নেই। সরকারি ‘Energy Scenario of Bangladesh 2024–25’ অনুযায়ী ওই অর্থবছরে মোট নিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল প্রায় ১০১,১৮৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা। এর ৪৪ শতাংশ এসেছে প্রাকৃতিক গ্যাস, ২৭ শতাংশ কয়লা, ১৬ শতাংশ আমদানি করা বিদ্যুৎ এবং ১১ শতাংশ ফার্নেস অয়েল থেকে। সৌরবিদ্যুতের অবদান ছিল মাত্র ১ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের ঝুঁকির বড় অংশ জড়িয়ে আছে গ্যাসের ঘাটতি, আমদানি-নির্ভর জ্বালানির দাম এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহপথের অনিশ্চয়তার সঙ্গে। সৌরবিদ্যুৎ এই সংকটের জাদুকরি একমাত্র ঔষধ নয়। এটি রান্নার গ্যাস, সার কারখানার ফিডস্টক কিংবা সব ধরনের শিল্প-তাপ সরাসরি প্রতিস্থাপন করবে না। কিন্তু দুপুরের বিদ্যুৎচাহিদা স্থানীয় সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো গেলে তেল ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যবহার কমানো সম্ভব হতে পারে। সঠিক সঞ্চালন ও চাহিদা ব্যবস্থাপনা থাকলে সেই সাশ্রয় করা গ্যাস শিল্প, সার উৎপাদন বা রাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেওয়া সম্ভব। তাই সৌরবিদ্যুৎকে শুধু ‘সবুজ’ প্রকল্প হিসেবে নয়, দেশীয় জ্বালানি-নিরাপত্তার অবকাঠামো হিসেবে দেখা দরকার।
বিশ্বব্যাংক এর ESMAP Global Solar Atlas বাংলাদেশের জন্য খুব পরিষ্কার একটি ছবি দেয়। ১৯৯৯–২০১৮ সময়ের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া তথ্য ধরে মানচিত্রটি দেখিয়েছিলো, সঠিকভাবে বসানো প্রতি ১ কিলোওয়াট-পিক সৌর প্যানেল থেকে গড়ে দিনে প্রায় ৩.৬–৪.২ কিলোওয়াট-ঘণ্টা, বছরে ১,৩১৪–১,৫৩৪ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি; কিন্তু দেশের প্রায় সব অঞ্চলই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য ব্যবহারযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি প্রকল্প-নথি বাংলাদেশের দৈনিক সৌর বিকিরণ প্রায় ৪–৬.৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা প্রতি বর্গমিটার হিসেবে উল্লেখ করেছে। নির্দিষ্ট ভূমি-শ্রেণি ধরে করা সেই সমীক্ষায় ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুতের কারিগরি সম্ভাবনা সর্বোচ্চ ১,৫৬,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নয়, অনেকটা ভূমি, গ্রিড, অর্থায়ন ও পরিবেশগত সীমা বাদ দিলে পাওয়া একটি কারিগরি সম্ভাবনা। তবু সংখ্যাটি নির্দেশ করে, বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যা সূর্যালোকের অভাব নয়; সমস্যা হলো উপযুক্ত ছাদ ও জমি চিহ্নিত করা, গ্রিডে যুক্ত করা, অর্থায়ন এবং সময়মতো বিদ্যুৎ সঞ্চয় করা।

এখানে উল্লেখ্য, SREDA-র জাতীয় ডেটাবেসে ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মোট স্থাপিত সৌরক্ষমতা দেখানো হয়েছে প্রায় ১,৫২৯ মেগাওয়াট-পিক; এর মধ্যে অন-গ্রিড প্রায় ১,১৪৬ মেগাওয়াট-পিক এবং অফ-গ্রিড প্রায় ৩৮৩ মেগাওয়াট-পিক। একই ডেটাবেসে নেট-মিটারিংভুক্ত ছাদ সৌরব্যবস্থা ৫,০৩১টি, মোট ক্ষমতা প্রায় ৩৩৮ মেগাওয়াট-পিক। অর্থাৎ বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে অপরিচিত নয়, কিন্তু রোদ ও ছাদের তুলনায় ব্যবহারের পরিমাণ এখনো খুব কম। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ সালে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎচাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। নীতিতে ছাদ সৌরবিদ্যুৎ, পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন, লোড সেন্টারের কাছে ব্যাটারি, স্মার্ট গ্রিড ও মাইক্রোগ্রিডের সুযোগ রাখা হয়েছে। জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিতে ২,০০০–৩,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্যও আছে। কিন্তু বর্তমান কর্মসূচির বড় অংশ ব্যাটারিবিহীন ও গ্রিড-সংযুক্ত; কমিউনিটি ব্যাটারির হিসাব, মালিকানা ও ট্যারিফের জন্য আলাদা বাস্তবায়নবিধি প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, প্রশাসনিক মানচিত্র আর বিদ্যুৎ-নেটওয়ার্কের মানচিত্র এক নয়। একটি ইউনিয়নের বাড়ি কয়েকটি ১১ কেভি ফিডার ও বহু বিতরণ ট্রান্সফরমারে ভাগ হয়ে থাকতে পারে। আবার একটি ফিডার একাধিক প্রশাসনিক এলাকার অংশ ছুঁতে পারে। তাই ব্যাটারির সবচেয়ে কার্যকর একক হবে ‘ফিডার’ বা ‘ট্রান্সফরমার-ক্লাস্টার’। কোনো ইউনিয়নে একটি ফিডার থাকলে একটি ব্যাটারিই যথেষ্ট; পাঁচটি ফিডার থাকলে পাঁচটি ছোট বা মাঝারি ব্যাটারি ভালো হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ দূরে টেনে নেওয়ার ক্ষতি, ভোল্টেজ সমস্যা এবং নেটওয়ার্ক আপগ্রেডের চাপ কমে। ব্যবস্থাটি দিনে প্রথমে বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাহিদা পূরণ করবে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ একই ফিডারের অন্য গ্রাহক ব্যবহার করবে; তারও পরে যা থাকবে, তা যৌথ ব্যাটারিতে যাবে। ব্যাটারি পূর্ণ হলে জাতীয় গ্রিডে রপ্তানি হবে। সন্ধ্যায় ব্যাটারি স্থানীয় পিক চাহিদা সামলাবে। গ্রিড বন্ধ হলে মাইক্রোগ্রিড আলাদা হয়ে হাসপাতাল, পানি পাম্প, টেলিকম, আশ্রয়কেন্দ্র এবং প্রতিটি বাড়ির সীমিত ‘জরুরি সার্কিট’ চালাবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয় আছে। সাধারণ গ্রিড-টাইড ইনভার্টার গ্রিড বন্ধ হলে নিরাপত্তার জন্য নিজেও বন্ধ হয়ে যায়, একে অ্যান্টি-আইল্যান্ডিং বলা হয়। ফলে ছাদে প্যানেল ও এলাকায় ব্যাটারি থাকলেই লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন গ্রিড-গঠনকারী ইনভার্টার, সুরক্ষা-রিলে, স্বয়ংক্রিয় সেকশনলাইজার, অনুমোদিত আইল্যান্ডিং ব্যবস্থা এবং পুনঃসংযোগের নিয়ম। অর্থাৎ এটি শুধু ব্যাটারি কেনার প্রকল্প নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ স্থানীয় বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
ধরা যাক ৫০০টি বাড়ি ও ছোট প্রতিষ্ঠানে গড়ে ২ কিলোওয়াট-পিক করে প্যানেল বসানো হলো। মোট ক্ষমতা হবে ১ মেগাওয়াট-পিক। Global Solar Atlas-এর দীর্ঘমেয়াদি গড় ধরে দিনে উৎপাদন হতে পারে প্রায় ৩.৬–৪.২ মেগাওয়াট-ঘণ্টা। যদি দিনের বেলায় অর্ধেক স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে আনুমানিক ১.৮–২.১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা উদ্বৃত্ত থাকবে। ক্ষতি, নিরাপত্তা-রিজার্ভ ও ব্যাটারির ব্যবহারযোগ্য সীমা ধরে প্রায় ২–২.৫ মেগাওয়াট-ঘণ্টার ব্যাটারি এবং ০.৫ মেগাওয়াটের power-conversion system একটি যৌক্তিক প্রাথমিক নকশা হতে পারে। ২ মেগাওয়াট-ঘণ্টা ব্যবহারযোগ্য শক্তি ০.৫ মেগাওয়াট হারে দিলে প্রায় চার ঘণ্টা চলে—এটাই kWh ও kW-এর সহজ সম্পর্ক।
এই হিসাব কেবল উদাহরণ। প্রকৃত আকার নির্ধারণে অন্তত ৬–১২ মাসের ১৫ মিনিট অন্তর লোড ডেটা, ছাদের ছায়া, বর্ষাকালের উৎপাদন, সন্ধ্যার পিক, ট্রান্সফরমারের সীমা এবং কোন লোড কতক্ষণ চালাতে হবে এ সবই দেখতে হবে। বার্ষিক গড় দিয়ে ব্যাটারি নকশা করলে টানা মেঘলা দিন বা দুর্যোগে ব্যবস্থা ব্যর্থ হতে পারে। একই সঙ্গে সেচ, বরফকল, কোল্ড স্টোরেজ, পানি পাম্প ও বৈদ্যুতিক যান চার্জিং যতটা সম্ভব সূর্যের সময়ে সরিয়ে দিলে ব্যাটারির প্রয়োজন কমে। সবচেয়ে সস্তা ব্যাটারি হলো যে ব্যাটারি চাহিদা-ব্যবস্থাপনার কারণে কিনতেই হলো না।

এখন আসা যাক কমিউনিটি ব্যাটারি প্রসঙ্গে, কমিউনিটি ব্যাটারি এখন আর কোন পরীক্ষাগারের ধারণা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধারণার প্রচলন শুরু হয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে দুটি শিক্ষা দেয়: প্রযুক্তিটি কাজ করে, কিন্তু সঠিক ট্যারিফ ও একাধিক আয় ছাড়া অর্থনীতি টেকে না।
সারণি ১: নির্বাচিত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অভিজ্ঞতা। অস্ট্রেলিয়ার সাশ্রয়-তথ্য সংবাদভিত্তিক; SOLshare-এর ফল প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রতিবেদনভিত্তিক।
| দেশ/স্থান | ব্যবস্থা | ফল ও বাংলাদেশের শিক্ষা |
| অস্ট্রেলিয়া Alkimos Beach | ১১৯ পরিবার; ১.১ MWh কমিউনিটি ব্যাটারি; পাঁচ বছরের পরীক্ষা। | অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলো সম্মিলিতভাবে ৮১,০০০ অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি সাশ্রয় করেছে এবং পিক সময়ে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া ৮৫% কমেছে। কিন্তু গ্রাহক-ফি ভর্তুকিযুক্ত ছিল; স্থায়ী ব্যবসা হিসেবে টেকেনি। শিক্ষা: শুধু বিদ্যুৎ কেনাবেচা নয়, নেটওয়ার্ক সেবা ও পিক কমানোর মূল্যও দিতে হবে। |
| ভারত Rani Bagh, Delhi | ১৫০ kW / ৫২৮ kWh ব্যাটারি বিতরণ সাবস্টেশনে; শতাধিক গ্রাহক ও জরুরি লোড। | পিক লোড, ভোল্টেজ, power factor ও frequency সামলায়; বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ১৫০ kW করে চার ঘণ্টা হাসপাতাল, পানি ও জরুরি গ্রাহককে দিতে পারে। শিক্ষা: ব্যাটারি ইউনিয়ন অফিসে নয়, প্রয়োজনমতো সাবস্টেশন/ট্রান্সফরমারের কাছে বসাতে হয়। |
| জাপান Higashi-Matsushima | ৭০টি বাড়ি, ১৫টি অ্যাপার্টমেন্ট ও চারটি হাসপাতাল নিয়ে সৌর-মাইক্রোগ্রিড। | স্থানীয়ভাবে প্রায় অর্ধেক শক্তি উৎপাদন এবং দুর্যোগে অন্তত তিন দিন গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালানোর লক্ষ্য/সক্ষমতা। শিক্ষা: কমিউনিটি ব্যাটারির মূল্য শুধু বিল কমানো নয়, দুর্যোগ সহনশীলতাও একটি পরিমাপযোগ্য সেবা। |
| বাংলাদেশ SOLshare | স্মার্ট দ্বিমুখী মিটার ও মোবাইল ক্রেডিটে P2P সৌরবিদ্যুৎ লেনদেন। | কোম্পানির ২০২৩ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১২০ টি P2P মাইক্রোগ্রিড, ২,৩০০-এর বেশি পরিবার/ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ৮০ হাজারের বেশি উপকারভোগী। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাটারির মডেল নয়, কিন্তু বাংলাদেশে স্থানীয় মিটারিং, ক্ষুদ্র লেনদেন ও ইকোসিস্টেম ধারণা কাজ করতে পারে তার দেশীয় প্রমাণ। |
এখানে প্রশ্ন আসে, যৌথ ব্যাটারি কেন সস্তা হতে পারে এবং কখন নাও হতে পারে। একটি বড় ব্যাটারির ইনভার্টার, তাপ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেক পরিবার ভাগ করে নেয়। সব পরিবারের পিক একই সময়ে না হওয়ায় বৈচিত্র্যের সুবিধাও পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ARENA-সমর্থিত বিশ্লেষণ বলছে, ১০০ কিলোওয়াট–১ মেগাওয়াট আকারের কমিউনিটি ব্যাটারি গৃহস্থালি ব্যাটারির তুলনায় খরচ ও গ্রিডে বেশি সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণের সক্ষমতায় সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু শুধু দুপুরে বিদ্যুৎ কিনে রাতে বিক্রি করে ব্যাটারির খরচ উঠে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতি টেকাতে একই ব্যাটারিকে কয়েকটি কাজ করতে হবে: গ্রাহকের সৌরবিদ্যুৎ সময় বদলে দেওয়া, স্থানীয় পিক কমানো, ট্রান্সফরমার আপগ্রেড পিছিয়ে দেওয়া, বাজারদরের পার্থক্য কাজে লাগানো, ভোল্টেজ ও ফ্রিকোয়েন্সি সহায়তা এবং জরুরি ব্যাকআপ। এক্ষেত্রে ARENA বিশ্লেষণও এই ‘value stacking’-কে প্রয়োজনীয় বলেছে। বাংলাদেশের জন্য utility–community–private ESCO অংশীদারিত্ব সবচেয়ে বাস্তবসম্মত হতে পারে: পরিবার ছাদ দেবে বা প্যানেলের মালিক হবে; বিতরণ সংস্থা বা প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত ESCO ব্যাটারি ও Energy Management System-এর মালিক/পরিচালক হবে; গ্রাহক উৎপাদনের ক্রেডিট পাবে এবং স্বচ্ছ storage-service fee দেবে। গ্রিড যদি সব সময় নির্ভরযোগ্য হয় এবং নেট-মিটারিংয়ে দুপুরের উদ্বৃত্ত রাতে সমমূল্যে ফেরত পাওয়া যায়, তবে ব্যাটারি না বসিয়ে গ্রিডকেই ‘ভার্চুয়াল ব্যাটারি’ হিসেবে ব্যবহার করা সস্তা হতে পারে। কমিউনিটি ব্যাটারির যৌক্তিকতা সবচেয়ে বেশি সেখানে, যেখানে সন্ধ্যার পিক, ভোল্টেজ সমস্যা, রপ্তানি-সীমাবদ্ধতা, ঘন ঘন বিভ্রাট বা দুর্যোগ-ঝুঁকি আছে। তাই রাজনৈতিকভাবে সমান ভাগে ব্যাটারি ছড়ানো নয়; ডেটা দেখে যেখানে মূল্য সবচেয়ে বেশি, সেখানে আগে বসাতে হবে।
কমিউনিটি ব্যাটারি বসাতে উঁচু ও বন্যামুক্ত স্থান, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, অগ্নি শনাক্তকরণ ও নির্বাপণ, আলাদা নিরাপত্তা-বেষ্টনী এবং জরুরি সাড়াদান পরিকল্পনা দরকার। চুক্তিতে ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতা, রাউন্ড-ট্রিপ দক্ষতা, সাইকেল-লাইফ ওয়ারেন্টি, ক্ষমতা কমে যাওয়ার সীমা, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ এবং মেয়াদ শেষে পুনর্ব্যবহার/নিরাপদ নিষ্পত্তির দায় স্পষ্ট করতে হবে। শুধু সর্বনিম্ন দরদাতা দেখে কেনা হলে কয়েক বছর পর ব্যাটারি একটি ব্যয়বহুল বর্জ্যে পরিণত হতে পারে যা একটি দুইমুখী ছুরি হয়ে যাবে। তাই, সমান জরুরি হলো হিসাবের ন্যায়সংগত নিয়ম। যার ছাদ নেই, ভাড়া বাড়িতে থাকে বা প্যানেল কেনার সামর্থ্য নেই, সে যেন ব্যবস্থার বাইরে না পড়ে। সে সমবায় বা সামাজিক সোলার শেয়ার কিনতে পারে, কম দামে জরুরি ব্যাকআপ নিতে পারে অথবা স্থানীয় স্কুল/বাজারের সৌরব্যবস্থার অংশীদার হতে পারে। প্রতিটি গ্রাহকের উৎপাদন, ব্যবহার, ব্যাটারিতে দেওয়া-নেওয়া, চার্জ এবং ক্রেডিট মোবাইল অ্যাপ ও কাগুজে বিলে দেখা যেতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা গোপনীয়তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির স্থানীয় ব্যবস্থাও দরকার।
তাহলে কাজটি কীভাবে শুরু হতে পারে? প্রথম কাজ একটি নতুন বড় প্রকল্প ঘোষণা নয়; বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর ফিডার-ডেটা খুলে তিন ধরনের পাইলট করা, একটি পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায়, একটি ঘন শহুরে এলাকায় এবং একটি উপকূলীয় দুর্যোগপ্রবণ এলাকায়। প্রতিটি পাইলটে ১০০–৫০০ গ্রাহক, স্কুল/ক্লিনিক/পানি পাম্পের জরুরি সার্কিট, স্মার্ট মিটার এবং ৬–১২ মাসের প্রকাশ্য কর্মক্ষমতা ডেটা থাকতে হবে।
দ্বিতীয় কাজ BERC ও SREDA-র মাধ্যমে কমিউনিটি স্টোরেজ এবং সিস্টেমের স্থানীয় ব্যবহার-এর ট্যারিফ তৈরি করা দরকার। কে ব্যাটারিতে চার্জ দিল, কে কখন বিদ্যুৎ নিল, স্থানীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মূল্য কত, জরুরি রিজার্ভের খরচ কে দেবে, এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া বিনিয়োগ আসবে না। Renewable Energy Policy 2025 দিকনির্দেশ দিয়েছে; এখন দরকার মিটারিং, P2P লেনদেন, islanding ও BESS-এর কার্যকর বিধি।
তৃতীয় কাজ হলো পরিবারের ওপর মূলধনী খরচ না চাপানো। জাতীয় রুফটপ কর্মসূচির utility OpEx, public–private ও third-party OpEx কাঠামোর সঙ্গে কমিউনিটি ব্যাটারি যোগ করা যায়। ১৫–২০ বছরের কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক চুক্তিতে বিনিয়োগকারী প্যানেল, ব্যাটারি, প্রতিস্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায় নেবে; গ্রাহক উৎপাদিত বা ব্যবহৃত বিদ্যুতের ভিত্তিতে অর্থ দেবে। IDCOL, বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন, জলবায়ু তহবিল ও carbon finance প্রথম দিকের ঝুঁকি কমাতে পারে।
চতুর্থ কাজ একটি উন্মুক্ত জাতীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: প্রতিটি পাইলটের সৌর উৎপাদন, ব্যাটারির state of charge, পিক কমানো, বিভ্রাটে সরবরাহের ঘণ্টা, হারানো শক্তি, বিল সাশ্রয় এবং নিরাপত্তা-ইস্যু প্রকাশ করতে হবে। সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কত মেগাওয়াট প্যানেল বসেছে নয়; কত ইউনিট জ্বালানি-নির্ভর বিদ্যুৎ প্রতিস্থাপিত হয়েছে, কত ঘণ্টা জরুরি সেবা চলেছে এবং প্রতি টাকার বিনিয়োগে কত সিস্টেম-সাশ্রয় হয়েছে সেটি।
যে কথা বলে শেষ করতে চাই। বাংলাদেশের রোদ যথেষ্ট; ছাদও কম নয়। যেটি অনুপস্থিত, সেটি হলো উৎপাদন, সঞ্চয়, স্থানীয় বিতরণ, অর্থায়ন ও হিসাবকে একসঙ্গে বাঁধা একটি ইকোসিস্টেম। ঘরে ঘরে আলাদা ব্যাটারি কিনতে বললে সৌরবিদ্যুৎ ধনী পরিবারের পণ্য হয়ে থাকবে। কিন্তু ছাদে বিতরণকৃত প্যানেল, ফিডারভিত্তিক যৌথ ব্যাটারি, স্মার্ট মিটার, স্থানীয় বিদ্যুৎ-বাজার এবং জাতীয় গ্রিডকে একসঙ্গে নকশা করলে সূর্যের বিদ্যুৎ পুরো এলাকার সম্পদ হতে পারে। এতে আগামীকালই সব গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শেষ হবে না। তবে কয়েক বছরের মধ্যে দিনের পিকের বড় অংশ দেশীয় সৌরবিদ্যুতে নেওয়া, ব্যয়বহুল তেল ও LNG-এর চাপ কমানো, রাতের গুরুত্বপূর্ণ লোড চালানো এবং দুর্যোগে স্থানীয় বিদ্যুৎ-সহনশীলতা গড়া সম্ভব। বাংলাদেশের পরবর্তী সৌরনীতি তাই কতটি প্যানেল বিক্রি হলো, সেই হিসাব থেকে বেরিয়ে আসুক। প্রশ্ন হোক: প্রতিটি পাড়ায় উৎপাদিত রোদ কীভাবে সবার বিদ্যুৎ হয়ে উঠবে?
লেখক: তাওহীদ হোসাইন
প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, EnvironmentMove.earth
গবেষক, কৃষি ও রিমোট সেন্সিং
লাইবনিজ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চ (ZALF), জার্মানি।
ই-মেইল: mdtawhid.hossain@zalf.de
EnvironmentMove@gmail.com
তথ্যসূত্র
Energy Scenario of Bangladesh 2024–25 — Hydrocarbon Unit; BPDB Annual Report 2024–25-ভিত্তিক উৎপাদন ও ব্যবহার তথ্য। মূল উৎস
Global Solar Atlas — Bangladesh — World Bank/ESMAP/Solargis-এর PVOUT, GHI ও GIS মানচিত্র। মূল উৎস
Bangladesh Sustainable Energy Support Program — সৌর বিকিরণ ও ১,৫৬,০০০ MW পর্যন্ত ইউটিলিটি-স্কেল কারিগরি সম্ভাবনার উল্লেখ। মূল উৎস
Renewable Energy Policy 2025 — P2P লেনদেন, BESS, rooftop solar, smart grid ও microgrid-এর নীতিগত কাঠামো। মূল উৎস
National Rooftop Solar Program Implementation Guideline — ২,০০০–৩,০০০ MW লক্ষ্য এবং utility/PPIS/third-party OpEx মডেল। মূল উৎস
Community Batteries: A Cost/Benefit Analysis — Australian National University / ARENA; কমিউনিটি ব্যাটারির আয়, খরচ ও value stacking। মূল উৎস
Alkimos Beach trial — Synergy-এর ১.১ MWh community battery trial এবং ABC-এর ফলাফল প্রতিবেদন। মূল উৎস
Rani Bagh Community Energy Storage — Tata Power-DDL/Nexcharge-এর ১৫০ kW / ৫২৮ kWh ব্যবস্থা। মূল উৎস
Higashi-Matsushima EcoTown — UC Berkeley EcoBlock-এর community microgrid ও resilience case study। মূল উৎস
SOLshare Annual Report 2023 — বাংলাদেশের P2P microgrid, উপকারভোগী ও প্রতিষ্ঠান-প্রতিবেদিত প্রভাব। মূল উৎস
