বাড়ির উঠানে শাকসবজি চাষ কি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে ?
বাড়ির উঠানে শাকসবজি ফলানো, কয়েকটি মুরগি পালন, পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে শেখা কিংবা বাড়তি ফসল বাজারে বিক্রি করা, এসবকে আমরা সাধারণত খাদ্য ও পুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ হিসেবেই দেখি। কিন্তু এগুলো কি একজন নারীর মানসিক স্বাস্থ্যেরও উপকার করতে পারে? বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের নিয়ে করা একটি নতুন গবেষণা বলছে, উত্তরটি সম্ভবত হ্যাঁ।
হবিগঞ্জের দুই উপজেলার নারীদের ওপর পরিচালিত তিন বছরের একটি পুষ্টিসংবেদনশীল কৃষি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে কর্মসূচি শেষ হওয়ার এক বছর পর বিষণ্নতার লক্ষণ তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, এই উপকারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ার মাধ্যমে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালে ‘বিএমজে গ্লোবাল হেলথ’ সাময়িকীতে। গবেষক দলে ছিলেন থালিয়া এম স্পার্লিং, সিজার কর্নেহো, ক্লাউডিয়া অফনার, অ্যাক্সেল মায়ার, জিলিয়ান এল ওয়েইড, সুনীথা কাদিয়ালা ও সাবিনে গাব্রিশ। তাঁরা লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ, হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনালের ঢাকা কার্যালয় এবং শারিতে–ইউনিভার্সিট্যাট মেডিজিন বার্লিনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। গবেষণার প্রশ্ন ও মূল বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দেন থালিয়া স্পার্লিং; মূল এফ-এ-এ-আর-এম পরীক্ষার প্রধান গবেষক ছিলেন সাবিনে গাব্রিশ।
খাবারের অভাব, অপুষ্টি আর মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক আছে, এটি নতুন কোন ধারণা নয়। আগের বহু গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো সমস্যা বেশি দেখা যায়। আবার বিষণ্নতা বা অন্য মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষের নিজের ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার সামর্থ্য, কাজের আগ্রহ এবং উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে, যার প্রভাব আবার পুষ্টির ওপরও পড়ে। অর্থাৎ সম্পর্কটি দুই দিকেই কাজ করতে পারে। কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন অমীমাংসিত ছিল। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও খারাপ মানসিক স্বাস্থ্য পাশাপাশি দেখা যায় বলেই কি একটি আরেকটির কারণ? নাকি দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ, সহিংসতা বা সামাজিক বৈষম্যের মতো অন্য কারণ দুটিকেই একসঙ্গে প্রভাবিত করছে?
আরও বড় প্রশ্ন ছিল, কোনো খাদ্য বা পুষ্টি কর্মসূচি বাস্তবে চালু করলে কি তার ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে? যদি ঘটে, ঠিক কোন পথে ঘটে?
গবেষকদের মতে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ বিষয়ে কারণ-ফল সম্পর্কের শক্ত প্রমাণ ছিল খুবই সীমিত। তানজানিয়ার একটি গবেষণায় পুষ্টি ও কৃষিভিত্তিক কর্মসূচির সঙ্গে নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল এবং সেখানে খাদ্যনিরাপত্তা একটি মধ্যবর্তী ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের কৃষি কর্মসূচি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে কীভাবে প্রভাব ফেলে, সেই পথ বিশ্লেষণ করার গবেষণা ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের এই গবেষণা।

গবেষণাটি হয়েছে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলায়। এলাকা দুটি গ্রামীণ এবং বন্যাপ্রবণ। মোট ৯৬টি বসতির ২৭০৫ জন বিবাহিত নারীকে মূল গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের বয়স ছিল ৩০ বছর বা তার কম এবং পরিবারের কাছে বাগান করার জন্য অন্তত ৪০ বর্গমিটার জমি থাকার শর্ত ছিল। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল। স্থানীয় সহযোগী ছিল ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট।
এটি শুধু ‘সবজি চাষ শেখানোর’ প্রকল্প ছিল না। বাড়ির বাগানে উন্নত পদ্ধতিতে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার উৎপাদন, প্রাকৃতিক উপায়ে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ ও জৈব সার ব্যবহার শেখানো হয়েছিল। উন্নত মুরগির ঘর ও টিকাদানের মাধ্যমে হাঁস-মুরগি পালন উন্নত করার চেষ্টা ছিল। পাশাপাশি মা ও শিশুর পুষ্টি, অসুস্থ শিশুর পরিচর্যা, অণুপুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাড়তি উৎপাদন বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রেও সহায়তা ছিল। প্রতিবেশী প্রায় ১৬ জন নারীকে নিয়ে ছোট ছোট দল গঠন করা হয়েছিল। তিন বছরে অন্তত ৩১টি দলীয় প্রশিক্ষণ সেশন দেওয়ার পাশাপাশি বাড়িতে গিয়ে ব্যক্তিগত পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। বীজ এবং উন্নত মুরগির ঘর তৈরির জন্য কিছু আর্থিক সহায়তাও ছিল। গড়ে প্রশিক্ষণে উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসূচিটি একই সঙ্গে কৃষি, পুষ্টি, আয়, জ্ঞান ও নারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ, একাধিক বিষয়কে ছুঁয়েছে।
২০১৫ সালে শুরুতে নারীদের শারীরিক অবস্থা, পরিবার ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কৃষিকাজ, খাদ্যাভ্যাস, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বিষণ্নতার লক্ষণসহ নানা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর চার বছর ধরে নিয়মিতভাবে খাদ্যনিরাপত্তা, খাদ্যের বৈচিত্র্য, কৃষি উৎপাদন এবং নারীর ক্ষমতায়নের বিভিন্ন সূচক পর্যবেক্ষণ করা হয়। শেষবারের বড় তথ্য সংগ্রহ হয় ২০১৯ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২০ সালের শুরু পর্যন্ত।
বিষণ্নতার লক্ষণ পরিমাপে ব্যবহার করা হয় ১০ প্রশ্নের ‘এডিনবরা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন স্কেল’। গত সাত দিনে একজন নারীর মনের অবস্থা কেমন ছিল, তার ভিত্তিতে একটি নম্বর তৈরি হয়। গবেষকেরা ১২ বা তার বেশি নম্বরকে সম্ভাব্য বিষণ্নতার লক্ষণ হিসেবে ধরেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি চিকিৎসকের করা রোগনির্ণয় নয়, এটি একটি যাচাইমূলক প্রশ্নমালা, যা কারও বিষণ্নতার সম্ভাবনা চিহ্নিত করে। শেষ পর্যায়ে মূল ২৭০৫ জন নারীর মধ্যে ২৫১৩ জনকে আবার পাওয়া গিয়েছিল, অর্থাৎ প্রায় ৯৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী শেষ পর্যন্ত গবেষণায় ছিলেন।
গবেষণা শুরুর সময়ই পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ কঠিন খাদ্যসংকটে ছিল। প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবার মারাত্মক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। আর ৬৯ শতাংশ নারী ন্যূনতম বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার খাচ্ছিলেন না। কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় এক বছর পর দেখা গেল, তুলনামূলক দলের ৩৮ শতাংশ নারী বিষণ্নতার লক্ষণের সীমা অতিক্রম করেছেন। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারীদের ক্ষেত্রে সেই হার ছিল ৩২ শতাংশ। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে গবেষকেরা হিসাব করেছেন, কর্মসূচিতে থাকা নারীদের বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়ার ‘অডস’ তুলনামূলক দলের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ কম ছিল।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা দরকার। ‘২৩ শতাংশ কম’ বলতে সরাসরি ২৩ শতাংশ কম নারী বিষণ্ন হয়েছেন, এ কথা বলা যাবে না। এটি পরিসংখ্যানের ‘অডস’-এর পার্থক্য। সাধারণ পাঠকের কাছে সবচেয়ে সহজ দৃশ্যমান তুলনা হলো, ৩৮ শতাংশ বনাম ৩২ শতাংশ।
কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য ভালো হলো কেন? এই প্রশ্নটিই গবেষণাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। গবেষকেরা তিনটি সম্ভাব্য পথ খুঁজেছেন, পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার উন্নতি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীর খাবারে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি।
ফলাফলে দেখা যায়, মোট মানসিক স্বাস্থ্যগত উপকারের প্রায় ৩৫ শতাংশ ব্যাখ্যা করা যায় খাদ্যনিরাপত্তার উন্নতি দিয়ে। সহজ ভাষায় বললে, যখন একটি পরিবার নিয়মিত ও পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হয়, তখন খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তাও কমতে পারে; সেটি নারীর মানসিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে নারীর ক্ষমতায়ন বা খাবারের বৈচিত্র্য আলাদাভাবে এই মানসিক স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন ব্যাখ্যা করেছে, এমন স্পষ্ট প্রমাণ এই বিশ্লেষণে পাওয়া যায়নি।
এতে অবশ্য বলা হচ্ছে না যে নারীর ক্ষমতায়ন বা পুষ্টিকর বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপ্রয়োজনীয়। বরং গবেষকেরা নিজেরাই সতর্ক করেছেন, ক্ষমতায়নের সূচকগুলো খুব সীমিত সময়ে মাপা হয়েছিল। অন্য সময় বা অন্য সূচক ব্যবহার করলে ফল ভিন্ন হতে পারতো। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকাংশ উন্নতি এই তিনটি পথ দিয়েও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। গবেষকেরা মনে করছেন, আয় ও আর্থিক স্থিতি, সামাজিক সহায়তা, নারীদের দলগত যোগাযোগ, পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক কিংবা বাড়তি সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণের মতো আরও কিছু বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বর্তমান গবেষণা থেকে সেগুলো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তাহলে আমরা আগে যা ভাবতাম, এখন তার সঙ্গে কী নতুন যোগ হলো ? এর আগে মূলত জানা ছিল যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে খারাপ মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক আছে। কিন্তু ‘সম্পর্ক আছে’ আর ‘একটিকে বদলালে অন্যটিও বদলায়’, এই দুই কথা এক নয়।
নতুন গবেষণার গুরুত্ব এখানে যে, বসতিগুলোকে দৈবভাবে কর্মসূচির অংশ ও তুলনামূলক দলে (কন্ট্রোল) ভাগ করা হয়েছিল। ফলে শুধু এই কথা নয় যে ভালো খাবার পাওয়া পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো; বরং এমন প্রমাণ পাওয়া গেল যে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি কৃষি কর্মসূচি পরবর্তী সময়ে নারীদের বিষণ্নতার লক্ষণও কমাতে পারে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় পুষ্টিসংবেদনশীল কৃষি কর্মসূচির সঙ্গে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের এমন পথভিত্তিক বিশ্লেষণ এটিই প্রথম।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর্মসূচিতে সরাসরি কোনো মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা বা বিষণ্নতা কমানোর অংশ ছিল না। তারপরও মানসিক স্বাস্থ্যে উপকার পাওয়া গেছে। এর মানে হতে পারে, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করার জন্য শুধু কাউন্সেলিং বা চিকিৎসাসেবা নয়, জীবনের মৌলিক অনিশ্চয়তাগুলো, যেমনঃ খাবার, কমিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় নীতিগত বার্তা হতে পারে, কৃষি, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি আলাদা খাত হিসেবে দেখলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো গ্রামীণ পুষ্টি কর্মসূচি যদি শুধু শিশুর ওজন বা নারীর খাবারের বৈচিত্র্য মাপে, তবে তার মানসিক স্বাস্থ্যগত উপকার অদৃশ্য থেকে যেতে পারে। ভবিষ্যতের কর্মসূচিতে তাই খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি নারীর মানসিক সুস্থতার সূচকও নিয়মিত মাপা যেতে পারে। এতে একটি কর্মসূচির প্রকৃত স্বাস্থ্যগত লাভ আরও পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব হবে। একইভাবে, যেসব কৃষি ও পুষ্টি কর্মসূচি খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ায়, সেগুলোর সেই অংশগুলোকে শক্তিশালী করা গেলে একই বিনিয়োগ থেকে পুষ্টির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেও সহ-উপকার পাওয়া যেতে পারে। গবেষকেরাও খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে দেখার কথা বলেছেন।
এঈ গবেষণাটি সামাজিক সুরক্ষা ও জীবিকা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন তোলে। পরিবারের খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, আয় ও আর্থিক স্থিতি যদি মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে, তাহলে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি সহায়তা, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য, এসব কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় করলে একাধিক সমস্যাকে একসঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। গবেষণাপত্রে আয়, সামাজিক ও আর্থিক সম্পদ এবং সামাজিক সুরক্ষাকে ভবিষ্যতে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই একটি গবেষণাই জাতীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি চালুর চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বরং এটি পুষ্টি ও কৃষি কর্মসূচি মূল্যায়নের সময় মানসিক স্বাস্থ্যকেও সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে।
গবেষণাটির নকশা শক্তিশালী হলেও সীমাবদ্ধতা আছে। বিষণ্নতা মূল এফ-এ-এ-আর-এম পরীক্ষার পূর্বনির্ধারিত প্রধান ফলাফল ছিল না। বিষণ্নতা চিকিৎসকের সাক্ষাৎকারে নির্ণয় করা হয়নি, বরং একটি যাচাই প্রশ্নমালা ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘গুরুতর বিষণ্নতা’ শনাক্ত করার জন্য এই প্রশ্নমালার নির্দিষ্ট সীমা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। নারীর ক্ষমতায়নের তথ্যও খাদ্যনিরাপত্তা বা খাদ্যবৈচিত্র্যের মতো বারবার সংগ্রহ করা হয়নি। অংশগ্রহণকারীরা কোন দলে আছেন, সেটিও তাঁদের কাছ থেকে বাস্তবে পুরোপুরি গোপন রাখা সম্ভব ছিল না।
আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ২০১৫ সালে দুই দলেই প্রায় ২০ শতাংশ নারীর মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া গেলেও শেষ পর্যায়ে সেটি বেড়ে তুলনামূলক দলে ৩৮ এবং কর্মসূচির দলে ৩২ শতাংশ হয়। গবেষকেরা বলছেন, সত্যিই বিষণ্নতা বেড়ে থাকতে পারে; আবার দীর্ঘদিন ধরে একই নারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ফলে তাঁরা নিজেদের সমস্যা প্রকাশে বেশি স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠায় পরবর্তী জরিপে লক্ষণ বেশি ধরা পড়াও সম্ভব। তাই সময়ের সঙ্গে এই বৃদ্ধিকে সরাসরি বাস্তব বৃদ্ধিই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
শেষ কথা
এই গবেষণা আমাদের একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়, মানুষের শরীর, মন এবং খাবারের নিশ্চয়তা আলাদা আলাদা জগতে বাস করে না। একজন নারী যদি জানেন তাঁর পরিবারের জন্য খাবার আছে, নিজের উঠানে কিছু উৎপাদন করতে পারেন, প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সম্পদ পান এবং আশপাশের নারীদের সঙ্গে একটি সহায়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকেন, তার সুফল শুধু পাতে নয়, মনেও পৌঁছাতে পারে।
হবিগঞ্জের এই গবেষণা সেই সম্পর্কের পুরো গল্প বলে ফেলেনি। কিন্তু গল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেখিয়েছে: অপুষ্টি কমানোর জন্য তৈরি একটি কৃষি কর্মসূচি, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার কোনো অংশই ছিল না, সেটি নারীর মানসিক সুস্থতারও উপকার করতে পারে, এবং সেই উপকারের অন্তত একটি পথ হলো পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা।
নীতিনির্ধারকদের জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কীভাবে মানুষের পাতে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছানো যাবে’ নয়। প্রশ্নটি আরও বড়, একটি খাদ্য ও কৃষি কর্মসূচিকে কীভাবে এমনভাবে সাজানো যায়, যাতে একই সঙ্গে পরিবারে খাবারের নিশ্চয়তা বাড়ে, নারীর জীবনযাত্রার চাপ কমে এবং তার মানসিক সুস্থতাও ভালো হয়?
