গুগোল কেন ৩.২ কোটি মশা ছাড়তে চায় ?

শুনতে অবাক লাগতে পারে, গুগোলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় আগামী দুই বছরে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মশা ছাড়তে চায়। তবে উদ্দেশ্য মশা বাড়ানো নয়; বরং মশা দিয়েই মশা কমানো। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমানো। প্রস্তাবটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা বা EPA-এর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অনুমোদন পেলে প্রথম বছরে ফ্লোরিডায় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ এবং দ্বিতীয় বছরে ক্যালিফোর্নিয়ায় আরও ১ কোটি ৬০ লাখ মশা ছাড়া হবে।

এই প্রকল্পটি পরিচালনা করছে অ্যালফাবেটের সহ প্রতিষ্ঠান ভেরিলি(Verily)। তাদের মশা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের নাম ডিবাগ (Debug)। ২০১৬ সাল থেকে তারা মশাবাহিত রোগ কমানোর জন্য রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। তাদের পরিকল্পনায় যে মশাগুলো ছাড়া হবে, সেগুলো হবে পুরুষ মশা। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না। মানুষ ও প্রাণীর রক্ত খায় শুধু স্ত্রী মশা। তাই কোটি কোটি পুরুষ মশা ছাড়লেও মানুষের কামড় খাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে না।

এই পদ্ধতির মূল অস্ত্র হলো (ওলবাখিয়া) Wolbachia নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া প্রকৃতিতে অনেক পোকামাকড়ের শরীরে পাওয়া যায়। তবে রোগ ছড়ানো কিছু মশার দেহে এটি স্বাভাবিকভাবে থাকে না। প্রথমে ল্যাবে বিপুল সংখ্যক পুরুষ মশার শরীরে Wolbachia ব্যাকটেরিয়া দেওয়া হয়। এরপর সেই পুরুষ মশাগুলো নির্দিষ্ট এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা যখন বুনো স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন স্ত্রী মশা ডিম পাড়লেও সেই ডিম ফুটে না। ফলে নতুন মশা জন্মায় না। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই ওই এলাকার মশার সংখ্যা কমে আসতে পারে।

এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য দুটি মশক গোষ্ঠী: এডিস এজিপ্টি (Aedes aegypti), যা ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া ছড়াতে পারে; এবং (কুলেক্স) Culex মশা, যা ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস ও সেন্ট লুইস এনসেফালাইটিসের মতো রোগ ছড়াতে পারে। ল্যাবে কোটি কোটি মশা তৈরি করা সহজ কাজ নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরুষ ও স্ত্রী মশা আলাদা করা। কারণ ভুল করে স্ত্রী মশা ছেড়ে দিলে সেটি মানুষকে কামড়াতে পারে। ভেরিলি জানিয়েছে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরুষ ও স্ত্রী মশা আলাদা করে। এরপর বিশেষ প্রজনন ব্যবস্থা ও নির্দিষ্ট যানবাহনের মাধ্যমে পরিকল্পিত এলাকায় পুরুষ মশা ছাড়া হবে।

মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা সাধারণত কীটনাশকের কথা ভাবি। কিন্তু কীটনাশকের দুটি বড় সমস্যা আছে। প্রথমত, অনেক এলাকায় মশা ধীরে ধীরে কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, কীটনাশক পরিবেশ, অন্য পোকামাকড় এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। আরেকটি সাধারণ পদ্ধতি হলো জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা, কারণ সেখানেই মশা ডিম পাড়ে। কিন্তু বাস্তবে সব প্রজননস্থল খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস সবচেয়ে সাধারণ মশাবাহিত রোগগুলোর একটি। অন্যদিকে, Aedes aegypti মশা ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালির মতো নতুন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি খুঁজছেন, যা কম রাসায়নিক ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে মশার সংখ্যা কমাতে পারে।

এই পদ্ধতি একেবারে নতুন নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে Wolbachia-ভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে বহু বছর ধরে Wolbachia-যুক্ত পুরুষ মশা ছাড়া হচ্ছে। কিছু এলাকায় Aedes aegypti মশার সংখ্যা ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও অনেক কমেছে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডেও ২০১১ সাল থেকে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কেয়ার্নস ও আশপাশের এলাকায় স্থানীয় ডেঙ্গু সংক্রমণ বড় মাত্রায় কমেছে, এবং এর প্রভাব বহু বছর ধরে স্থায়ী ছিল। যুক্তরাষ্ট্রেও ছোট পরিসরে পরীক্ষা হয়েছে। ২০১৭ সালে ফ্লোরিডার কী ওয়েস্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনো কাউন্টিতে এই ধরনের কাজ করা হয়। ফ্রেসনোতে Verily প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ লাখ মশা ছেড়েছিল। ২০১৮ সালে মায়ামিতেও পরীক্ষা চালানো হয়। ব্রাজিলেও ডেঙ্গু-প্রবণ এলাকায় পরীক্ষায় Aedes aegypti মশার সংখ্যা বড় মাত্রায় কমেছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

তবে, এত বড় পরিসরে মশা ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়ে কিছু প্রশ্নও আছে। পরিবেশবিদদের একাংশ জানতে চান এতে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কি না। মশার সংখ্যা কমলে খাদ্যশৃঙ্খলে কোনো পরিবর্তন হবে কি না, সেটিও একটি আলোচনার বিষয়। তবে কর্মকর্তাদের মতে, অনেক এলাকায় Aedes aegypti স্থানীয় প্রজাতি নয়; এটি একটি আক্রমণকারী প্রজাতি। তাই এদের সংখ্যা কমলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। এ মূহুর্তে EPA এখন জনসাধারণের মতামত নিচ্ছে। জনমত ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গুগল বা অ্যালফাবেটের এই পরিকল্পনার মূল ভাবনা খুব সহজ: মশা মারতে শুধু রাসায়নিক নয়, মশার নিজস্ব জৈব ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যায়। Wolbachia-যুক্ত পুরুষ মশা ছেড়ে রোগবাহী মশার বংশবৃদ্ধি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগের ছোট পরীক্ষাগুলো আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রে বড় পরিসরে এই পদ্ধতি কতটা সফল হয়, এবং এটি ভবিষ্যতে রাসায়নিক কীটনাশকের নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে কি না।

আরো দেখান
Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading