সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে রাশিয়া: বাংলাদেশে আগত পরিযায়ী পাখির গতিপথ কী বার্তা দেয় ?
শীতের এক সকালে কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপ। জোয়ার নামছে। কাদাচরের ওপর ছোট ছোট পাখির দল খাবার খুঁজছে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে এরা শুধু শীতের অতিথি পাখি। কয়েক মাস থাকবে, তারপর চলে যাবে। কিন্তু এই ছোট্ট পাখিদের জীবন আসলে এক বিশাল ভ্রমণের গল্প। কেউ এসেছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে। কেউ রাশিয়া, কেউ মধ্য এশিয়া, কেউ চীন বা মঙ্গোলিয়ার দিক থেকে। বাংলাদেশ তাদের কাছে শুধু একটি দেশ নয়; এটি দীর্ঘ যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়, খাবারের জায়গা, আর কখনও কখনও জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগ।
পরিযায়ী পাখিদের এই দীর্ঘ পরিযান যাত্রাটি ক্লান্তি, শারীরিক রূপান্তর আর অবিশ্বাস্য সহনশীলতার এক মহাকাব্যিক গল্প। নতুন এক গবেষণা বলছে, এই পাখিদের ভবিষ্যৎ শুধু তারা কোথায় জন্মায় বা কোথায় শীত কাটায়, তা দিয়ে বোঝা যাবে না। বরং সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হতে পারে: দীর্ঘ পরিযান যাত্রার পথে তারা কোথায় থামে এবং বিশ্রাম নেয়?
এই দীর্ঘ ভ্রমণের গল্পটি নতুন করে সামনে এনেছে ২০২৬ সালের ১ মে প্রকাশিত একটি গবেষণা। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে রয়্যাল সোসাইটির বিজ্ঞান সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি: বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস-এ। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের স্কোপ ফাউন্ডেশনের ড. সায়েম ইউ. চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন স্কোপ ফাউন্ডেশন, ঢাকা-এর মোহাম্মদ ফয়সাল ও নাজিম উদ্দিন খান; চীনের ডিউক কুনশান বিশ্ববিদ্যালয়ের চি-ইয়াং চই ও ওয়াংওয়াং চিউ; ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল জে. ফিল্ড, রিস ই. গ্রিন ও অ্যান্ড্রু বামফোর্ড; এবং যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ ট্রাস্ট ফর অরনিথোলজির নাইজেল ক্লার্ক। গবেষণায় বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপে ১৪ বছরের সৈকতপাখি গণনার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং মিলিয়ে দেখা হয়েছে যে, বাংলাদেশে শীত কাটানো কিছু পাখি এরপর কোন পথে ফিরে যায়, কোথায় থামে, আর কোন ধরনের জলাভূমি ব্যবহার করে। ২০টি সৈকতপাখির ওপর করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১২টি প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমেছে। গবেষণার মডেল অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চামচঠুঁটো বাটানের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০.৬% হারে কমেছে। একইভাবে বড় নটের সংখ্যা বছরে গড়ে প্রায় ১৯.৯% এবং নর্ডম্যানের সবুজপার সংখ্যা বছরে গড়ে প্রায় ১৫.৫% হারে কমেছে।

এখানেই গবেষণার গল্পে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে। বাংলাদেশে শীত কাটানো সব সৈকতপাখি একই পথ ধরে ফিরে যায় না। বাইরে থেকে দেখলে সবাইকে একই রকম “অতিথি পাখি” মনে হতে পারে, কিন্তু তাদের ভ্রমণপথ এক নয়। কেউ উপকূলের কাদাচর ধরে ধরে এগোয়, আবার কেউ বাংলাদেশ উপকূল ছেড়ে ভেতরের দিকে উড়ে যায় হিমালয়ের ওপর দিয়ে, চীন ও মধ্য এশিয়ার ভেতরের জলাভূমির দিকে। যেমন চামচঠুঁটো বাটানের মতো পাখি যাত্রাপথে মূলত উপকূলীয় জায়গার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু পাতি লালপা, কালালেজ জৌরালি, নাটা গুলিন্দার মতো কিছু পাখি বাংলাদেশে শীত কাটালেও পরে উপকূল ধরে না গিয়ে ভেতরের পথ ব্যবহার করে। ছোট ধুলজিরিয়া বা Tibetan Sand-Plover-এর মতো কিছু অ-উপকূলীয় পথ ব্যবহারকারী পাখির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বা বাড়তি প্রবণতাও দেখা গেছে। তাই গবেষণার বড় বার্তাটি হলো: পাখির সংখ্যা কমবে না টিকবে, তা শুধু বাংলাদেশে তারা কতদিন থাকে তা দিয়ে বোঝা যায় না; তাদের পুরো যাত্রাপথে কোথায় কোথায় থামে, সেটাও দেখতে হয়।

ছবিঃ পরিযায়ী সৈকতপাখির দুই ধরনের পথ। উপরের অংশে চামচঠুঁটো বাটানের মতো উপকূলনির্ভর পাখির চলাচল দেখা যাচ্ছে, যারা যাত্রাপথে মূলত উপকূলীয় কাদাচর ও মোহনার ওপর নির্ভর করে। নিচের অংশে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শীত কাটানো কিছু পাখি উপকূল ছেড়ে ভেতরের পথে উড়ে যায় এবং হিমালয় অঞ্চল পেরিয়ে ভেতরের জলাভূমি ব্যবহার করে। সূত্র: Chowdhury et al. (2026), Proceedings of the Royal Society B; CC BY 4.0 থেকে বাংলায় অভিযোজিত।
তবে মহাদেশীয় পথ ব্যবহার করলেই যে পাখিরা পুরোপুরি নিরাপদ, তা নয়। বরং এই গবেষণা আরেকটি কম আলোচিত ঝুঁকির দিকে নজর দেয়। কিংহাই-তিব্বত মালভূমি (Qinghai–Tibet Plateau) অঞ্চলে ট্র্যাক করা পাখিদের ব্যবহৃত বিশ্রাম এলাকার ৬৪% সুরক্ষিত এলাকার বাইরে। অর্থাৎ পাখিরা যে জায়গাগুলোতে থেমে শক্তি সঞ্চয় করে, তার অনেকগুলোই এখনো যথেষ্ট সুরক্ষার আওতায় নেই। আরও বড় সমস্যা হলো, উপকূলীয় এলাকার তুলনায় এসব ভেতরের জলাভূমিতে নিয়মিত পাখি পর্যবেক্ষণও কম হয়। ফলে পাখিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গা মানুষের নজরের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
এই গবেষণার সৌন্দর্য হলো, এটি বাংলাদেশকে শুধু “শীতের অতিথি পাখির দেশ” হিসেবে দেখায় না। বরং বাংলাদেশকে এশিয়ার বিশাল পরিযায়ী পাখির পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে দেখায়। সোনাদিয়া, নিঝুম দ্বীপ, কক্সবাজার উপকূল, মেঘনা মোহনা এসব জায়গা শুধু স্থানীয় প্রকৃতির অংশ নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক পাখি-যাত্রার অংশ।
গবেষণাটি কী বলে, আর কী বলে না ?
এই গবেষণা পড়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এটি আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ছবি দেখায়, কিন্তু পুরো ছবি দেখায় না। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পাখি গণনার বড় অংশ এসেছে সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে। তাই সোনাদিয়ার তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা বোঝা যায়, কিন্তু পুরো বাংলাদেশ বা পুরো এশিয়ার সব জলাভূমির অবস্থা সরাসরি বলা যায় না।
স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পাখির পিঠে ছোট যন্ত্র বসিয়ে তাদের পথ জানা খুব মূল্যবান কাজ, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ট্র্যাক করা পাখির সংখ্যা ছিল সীমিত, ৮টি পাতি লালপা, ২টি কালালেজ জৌরালি এবং ১টি নাটা গুলিন্দা। এর সঙ্গে আগের গবেষণা থেকে চামচঠুঁটো বাটানের পথের তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আরও বেশি পাখি ও আরও বেশি জায়গা থেকে তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে ছবিটি আরও পরিষ্কার হবে।
আরেকটি সতর্কতার জায়গা হলো কারণ-সম্পর্ক। গবেষণাটি দেখাচ্ছে, পাখির যাত্রাপথে তারা কোন ধরনের জায়গায় থামে, উপকূলীয় কাদাচর, না ভেতরের জলাভূমি, তার সঙ্গে তাদের সংখ্যা বাড়া-কমার প্রবণতার শক্ত সম্পর্ক আছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে শুধু এই এক কারণেই পাখির সংখ্যা কমছে। উপকূলনির্ভর পাখিরা একসঙ্গে অনেক চাপের মুখে পড়ে: কাদাচর হারিয়ে যাওয়া, উন্নয়ন, দূষণ, শিকার, মাছ ধরার জালে আটকে পড়া, জলবায়ু পরিবর্তন, এমনকি উপকূলীয় এলাকায় মৎস্যচাষের ঘেরে পাখি মারা যাওয়ার ঘটনাও আছে। তাই এই গল্প একক কোনো কারণের নয়; এটি আসলে পুরো যাত্রাপথের নিরাপত্তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার গল্প।
গবেষণায় আরও একটি বিষয় ব্যবহার করা হয়েছে, সাধারণ পাখিপ্রেমী ও পর্যবেক্ষকদের জমা দেওয়া পাখি দেখার তথ্য। এ ধরনের তথ্য খুব দরকারি, কারণ এতে বড় এলাকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে এর সীমাবদ্ধতাও আছে। মানুষ সাধারণত শহরের কাছে, রাস্তার পাশে বা সহজে যাওয়া যায় এমন জায়গায় বেশি পাখি দেখে ও তথ্য জমা দেয়। দূরের, দুর্গম বা কম পরিচিত জলাভূমি অনেক সময় নজরের বাইরে থেকে যায়। ফলে কোথায় পাখি কম দেখা যাচ্ছে, সেটি সবসময় পাখি কম থাকার কারণে নাও হতে পারে; অনেক সময় সেখানে মানুষ কম যায় বলেও তথ্য কম থাকতে পারে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো থাকা সত্ত্বেও গবেষণাটির মূল বার্তা দুর্বল হয় না। বরং আরও পরিষ্কার হয়। পরিযায়ী পাখিকে বুঝতে হলে শুধু বাংলাদেশে তারা কোথায় আসে, সেটি দেখলেই হবে না। তাদের পুরো যাত্রাপথ, কোথায় থামে, কোথায় খাবার খায়, কোথায় বিশ্রাম নেয়, আর কোন জায়গাগুলো সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে, সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হবে।
কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও এই গবেষণার বার্তা খুব পরিষ্কার। পরিযায়ী পাখিকে বাঁচাতে হলে শুধু তারা বাংলাদেশে কোথায় আসে, সেটি দেখলেই হবে না; দেখতে হবে তারা পুরো যাত্রাপথে কোথায় কোথায় থামে, কোথায় খাবার খায়, আর কোন জায়গায় শক্তি সঞ্চয় করে আবার উড়ে যায়। কারণ একটি পাখির জীবন শুধু তার গন্তব্য দিয়ে তৈরি হয় না, তার পথের প্রতিটি নিরাপদ আশ্রয়ও সেই জীবনের অংশ।
এ কারণেই শুধু বাংলাদেশের উপকূল, সোনাদিয়া বা নিঝুম দ্বীপ রক্ষা করলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। আবার শুধু হলুদ সাগর অঞ্চলের বড় বড় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত থামার জায়গা রক্ষা করলেও হবে না। গবেষণাটি মনে করিয়ে দেয়, কম আলোচিত অভ্যন্তরীণ জলাভূমিগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ কোনো পাখি যদি বাংলাদেশ থেকে উড়ে গিয়ে হিমালয়ের ওপারে কোনো জলাভূমিতে থামে, তাহলে সেই অচেনা জলাভূমিও বাংলাদেশের অতিথি পাখির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
পরিযায়ী পাখির জীবন যেন এক দীর্ঘ পথের ভ্রমণ। পথে খাবারের জায়গা হারিয়ে গেলে, বিশ্রামের জায়গা নষ্ট হয়ে গেলে, নিরাপদে রাত কাটানোর জায়গা না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। পাখিদের ক্ষেত্রেও তাই। তারা কোনো দেশের সীমানা মানে না, পাসপোর্ট নিয়ে উড়ে না; কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ পথ দরকার, নিরাপদ কাদাচর দরকার, নিরাপদ জলাভূমি দরকার।
বাংলাদেশের উপকূল তাই শুধু কাদামাটি, চর আর জোয়ার-ভাটার জায়গা নয়। এটি এশিয়ার আকাশপথে উড়ে চলা অসংখ্য পাখির এক ব্যস্ত বিরতি-স্টেশন। এখানে তারা কয়েক মাসের জন্য থামে, খাবার খায়, শক্তি সঞ্চয় করে, তারপর আবার দূরের পথে উড়ে যায়। তাদের ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে শুধু আকাশে উড়ে যাওয়া পাখির দিকে নয়, তাদের থামার জায়গাগুলোর দিকেও।
