ঢাকার রোগ থেকে সারাদেশের: ২৪ বছরে ডেঙ্গুর বদলে যাওয়া মানচিত্র

ডেঙ্গুর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিচয় নতুন নয়। ষাটের দশকেই ঢাকায় এর উপস্থিতির কথা জানা যায়। তবে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ডেঙ্গুকে অনেকটা রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবেই দেখা হতো। বর্ষা এলে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ত, কিছুদিন আলোচনা চলত, তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যেত। কিন্তু গত দুই দশকের তথ্য বলছে, সেই বাংলাদেশ আর নেই।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন এন্ড ইন্টারন্যাশনাল হেলথ -এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের ডেঙ্গুর ২৪ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি করেছেন অনন ভৌমিক, মাহমুদুল হাসান, গৌতম সাহা ও হুয়াইপিং ঝু। তারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), আইইডিসিআর (IEDCR), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সরকারি উৎসের তথ্য ব্যবহার করে দেখতে চেয়েছেন ডেঙ্গুর মানচিত্র কীভাবে বদলেছে, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং জলবায়ু ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটা।

গবেষকদের ভাষায়, বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি “শহর-কেন্দ্রিক মহামারি” থেকে ধীরে ধীরে “দেশব্যাপী” সমস্যায় রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ এটি আর কেবল কোনো নির্দিষ্ট শহর বা মৌসুমের রোগ নয়; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ীভাবে উপস্থিত একটি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে উঠছে। গবেষণার ফলাফল থেকে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট। ২০১৯ সালের আগে ডেঙ্গুর বড় অংশই ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। কিন্তু ২০১৯ সালের পর রোগটি দ্রুত দেশের অন্যান্য বিভাগ ও জেলায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। একসময় যে রোগকে মূলত নগর সমস্যা মনে করা হতো, তা এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৩ সালে। ওই বছর বাংলাদেশে ৩ লাখ ২১ হাজারেরও বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় এবং ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। দেশের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব। তুলনার জন্য বলা যায়, ২০১৮ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে, এই সংখ্যাগুলোই তার প্রমাণ।

২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গু সংক্রমণের ভৌগোলিক বিস্তারের পরিবর্তন। ২০০১–২০১৮ সময়ে ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিভাগ। তবে ২০১৯ সালের পর সংক্রমণ দ্রুত দেশের অন্যান্য বিভাগে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় প্রায় সব বিভাগেই উচ্চ সংক্রমণ দেখা যায়, যা ডেঙ্গুর ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ থেকে দেশব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। গাঢ় রং অধিক সংক্রমণের সংখ্যা নির্দেশ করে। CC BY 4.0 থেকে বাংলায় অভিযোজিত।

গবেষণাটি বয়সভিত্তিক ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে। দেখা গেছে, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সম্ভবত কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাইরে বেশি সময় কাটানোর কারণে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। কিন্তু মৃত্যুর চিত্র ভিন্ন। আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ ডেঙ্গুর ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়; বয়সভেদে এর প্রভাবও আলাদা।

তাহলে ডেঙ্গুর এই বিস্তার কেন ঘটছে?

গবেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। বাংলাদেশের শহরগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, নতুন নতুন সড়ক ও অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, মানুষের চলাচল আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে শহরের প্রান্তবর্তী ও আধা-নগর এলাকায় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে, কিন্তু সেই অনুপাতে পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হচ্ছে না। ফলে অনেক জায়গায় এডিস মশার জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

গবেষণাটি জলবায়ুর দিকেও আঙুল তুলেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯–২০২৪ সময়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ওঠানামা আগের সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। ২০২৩ সালে গবেষণার পুরো সময়কালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, আর ২০২৪ সালে দেখা যায় অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল হওয়ায় গবেষকরা মনে করেন, জলবায়ুগত অস্থিরতাও ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

তবে এখানেই একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গবেষণাটি জলবায়ু পরিবর্তন ও ডেঙ্গুর মধ্যে সম্পর্ক দেখালেও এটি প্রমাণ করতে পারেনি যে জলবায়ু পরিবর্তনই ডেঙ্গু বৃদ্ধির একমাত্র কারণ। বাস্তবে নগর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, মানুষের আচরণ, মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং মানুষের চলাচলের ধরন সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু বেড়েছে” এমন সরল সিদ্ধান্ত এই গবেষণা থেকে টানা ঠিক হবে না।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো, এটি নতুন মাঠ গবেষণা নয়; বরং একটি Narrative Review বা পর্যালোচনামূলক গবেষণা। অর্থাৎ গবেষকরা নিজেরা নতুন তথ্য সংগ্রহ করেননি; বিদ্যমান সরকারি তথ্য ও প্রকাশিত গবেষণা একত্র করে বিশ্লেষণ করেছেন। ফলে যেসব রোগী কখনও পরীক্ষা করাননি, অথবা সরকারি ব্যবস্থার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন, তারা এই হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারেন। গবেষণাটিও স্বীকার করেছে যে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে।

তবুও গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত অন্য কোথাও। ডেঙ্গুর মানচিত্র বদলে গেছে। এটি আর শুধু ঢাকার মৌসুমি সমস্যা নয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল এখন এই ঝুঁকির অংশ। তাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইও শুধু হাসপাতালে বেড বাড়ানো বা মশা মারার ওষুধ ছিটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, স্থানীয় নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা সবকিছুকেই একই ছবির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এই গবেষণার সূত্র ধরেই আমরা এল নিনোর বছর ২০২৬ এ আরও ভয়াবহ ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দেখতেও পারি। ফলে, ডেঙ্গু মহামারি শুরু হবার আগেই আমরা স্থানিক ডাটা বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন প্রধান পদক্ষেপ হওয়া জরুরী।

আরো দেখান
Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading