বাংলাদেশের বাজারে ভোজ্যতেলে অতিক্ষুদ্র মাইক্রো প্লাস্টিক, আমরা কী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ?

বাংলাদেশে একটি সাধারণ দিনের কথা ভাবুন। সকালের নাশতা থেকে রাতের খাবার, প্রায় প্রতিটি রান্নায় আমরা সয়াবিন তেল ব্যবহার করি। এই তেল আমাদের খাবারের স্বাদ বাড়ায়, শক্তি দেয়। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি এই তেলের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা?

সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে এই কঠিন সত্য। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় সব সয়াবিন তেলেই মাইক্রোপ্লাস্টিক উপস্থিত রয়েছে, তা বোতলজাত (ব্র্যান্ডেড) হোক বা খোলা (নন-ব্র্যান্ডেড)। বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অফ ফুড কম্পোজিশন এন্ড এনালাইসিস ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ “Microplastic contamination in branded and non-branded edible Soybean oil from Bangladesh” শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ করে যেটির পেছনে কাজ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP)-এর একদল গবেষক। পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এর পক্ষ থেকে এতে যৌথভাবে কাজ করেছেন সহকারী অধ্যাপক মো. আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, গবেষক রুনা আক্তার মীম, মো. আশিকুর রহমান, অমিত হাসান অনিক, সাদিয়া জাহান, সাদিয়া আক্তার নিশি এবং হাইড্রোবায়োজিওকেমিস্ট্রি অ্যান্ড পলিউশন কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর অধ্যাপক শফি এম. তারেক।

এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল জানতে চাওয়া যে বাংলাদেশের বাজারে বিদ্যমান সয়াবিন তেলে কি মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে? থাকলে কতটা আছে? কোন ধরনের প্লাস্টিক কণা বেশি পাওয়া যায়? সেগুলোর আকার, রং, আকৃতি ও রাসায়নিক ধরন কী? এবং নিয়মিত সয়াবিন তেল খাওয়ার মাধ্যমে মানুষ, বিশেষ করে শিশু, কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসতে পারে? গবেষকরা বিশেষভাবে ব্র্যান্ডেড তেল ও নন-ব্র্যান্ডেড/খোলা তেল, এই দুই ধরনের তেলের মধ্যে তুলনা করেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্র্যান্ডেড তেল সাধারণত প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত পরিবেশে আসে, আর নন-ব্র্যান্ডেড তেল অনেক সময় খোলা বাজারে, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক পাত্রে বা কম নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বিক্রি হয়।

মাইক্রোস্কোপে দেখা সয়াবিন তেলের ভেতরে থাকা বিভিন্ন আকার, রং ও ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা। গবেষণায় এসব কণার মধ্যে আঁশের মতো fiber, ভাঙা টুকরোর মতো fragment, ছোট দানা, film ও pellet ধরনের কণা শনাক্ত করা হয়েছে।

গবেষকরা ঢাকার বিভিন্ন দোকান ও খোলা বাজার থেকে মোট ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ছিল পরিচিত ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তেল এবং খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া তেল। এরপর তাঁরা তেলের ভেতরে থাকা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা আলাদা করার চেষ্টা করেন। এর জন্য তেলকে বিশেষ দ্রবণের সঙ্গে মিশিয়ে পাতলা করা হয়, যাতে তেল সহজে ছেঁকে ফেলা যায় এবং প্লাস্টিক কণাগুলো ফিল্টারের ওপর থেকে যায়। এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিক কণাগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দ্রুত শনাক্ত করা যায়। পরে গবেষকরা মাইক্রোস্কোপে কণাগুলোর আকার, রং ও ধরন দেখেন। আরেকটি পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন, কণাগুলো কোন ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। শেষে খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে কণাগুলোর গায়ের দাগ, ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করেন। সহজভাবে বললে, তাঁরা শুধু তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কি না তা দেখেননি; বরং সেগুলো দেখতে কেমন, কত বড়, কী রঙের, কোন প্লাস্টিকের তৈরি এবং কোথা থেকে আসতে পারে এসবও বোঝার চেষ্টা করেছেন।

সয়াবিন তেলের সব নমুনা মিলিয়ে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার ধরন, রং ও আকারের সামগ্রিক চিত্র। গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি কণা ছিল আঁশের মতো fiber, রঙের দিক থেকে স্বচ্ছ কণা বেশি পাওয়া গেছে, আর আকারের দিক থেকে ১০১–৫০০ মাইক্রোমিটার কণা সবচেয়ে বেশি ছিল।

গবেষণায় পরীক্ষা করা সব সয়াবিন তেলেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ব্র্যান্ডেড তেল হোক বা খোলা বাজারের তেল, কোনোটিই পুরোপুরি মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত ছিল না। গড়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে প্রায় ৫৪ হাজারটি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তবে খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া নন-ব্র্যান্ডেড তেলে এই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ব্র্যান্ডেড তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৮ হাজারটি কণা পাওয়া গেলেও, নন-ব্র্যান্ডেড তেলে পাওয়া গেছে প্রায় ৬০ হাজারটি কণা। সহজভাবে বললে, খোলা বাজারের তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বেশি দেখা গেছে। গবেষকরা শুধু কত মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে সেটাই দেখেননি; এগুলো দেখতে কেমন, সেটিও পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, তেলের ভেতরে থাকা প্লাস্টিক কণাগুলো নানা ধরনের, কিছু আঁশের মতো, কিছু ভাঙা টুকরোর মতো, কিছু পাতলা পর্দার মতো, আবার কিছু ছোট দানার মতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে আঁশের মতো কণা। মোট মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রায় ৮২.৫% ছিল এই ধরনের আঁশজাতীয় কণা। এগুলো সম্ভবত কাপড়, বাতাসের ধুলো, প্লাস্টিকের পাত্র, প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি বা খোলা পরিবেশ থেকে তেলে মিশে যেতে পারে। আকারের দিক থেকে বেশিরভাগ কণাই ছিল খুব ছোট। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা। এগুলো এত ছোট যে সাধারণ চোখে দেখা যায় না। মাইক্রোস্কোপ ছাড়া এগুলো শনাক্ত করা কঠিন। এই কারণেই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণকে অনেক সময় “অদৃশ্য দূষণ” বলা যায়, আমরা চোখে দেখি না, কিন্তু এটি খাবারের ভেতর থাকতে পারে। গবেষকরা আরও পরীক্ষা করে দেখেছেন, তেলে পাওয়া কণাগুলো আসলে কোন ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। তাঁরা ছয় ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে কিছু প্লাস্টিক সাধারণত বোতল, প্যাকেট, ড্রাম, ঢাকনা, সিল, লেবেল বা খাদ্য সংরক্ষণের পাত্রে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু প্লাস্টিক এমনও পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত ফিল্টার কাপড়, মেশ বা তেল প্রক্রিয়াজাত করার যন্ত্রপাতি থেকে আসতে পারে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণায় PU এবং nylon ধরনের প্লাস্টিকও পাওয়া গেছে, যা খাদ্যতেলে আগে খুব কম রিপোর্ট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই ফলাফল দেখায়, সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু বোতল বা প্যাকেট থেকে আসে না। বরং তেল তৈরির কারখানা, ফিল্টারিং, প্যাকেজিং, পরিবহন, সংরক্ষণ, দোকানে বিক্রির পদ্ধতি এবং খোলা বাজারে হাতবদলের সময়ও প্লাস্টিক কণা তেলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তাই সমস্যাটি শুধু ভোক্তার নয়; এটি পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার একটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্ন।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সয়াবিন তেল খাওয়ার মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি—প্রতিদিন প্রায় ৭৭টি কণা। বছরে হিসাব করলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে সয়াবিন তেলের মাধ্যমে প্রায় ৬,৪০০টি এবং একটি শিশুর শরীরে প্রায় ২৮,০০০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা ঢুকতে পারে। দীর্ঘ জীবনকাল ধরে এই সংখ্যা আরও অনেক বড় হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি চিন্তার, কারণ তাদের শরীরের ওজন কম। একই খাবার বা একই পরিমাণ তেল থেকে পাওয়া দূষণ শিশুদের শরীরে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে, এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি: এই গবেষণা রোগের সরাসরি প্রমাণ দেয়নি। এটি দেখিয়েছে, সয়াবিন তেল মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। এই গবেষণার নতুনত্ব হলো, এটি বাংলাদেশের বাজারের সয়াবিন তেল নিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষকরা শুধু তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কি না, সেটি দেখেননি। তাঁরা ব্র্যান্ডেড ও খোলা বাজারের তেলের মধ্যে তুলনা করেছেন, কণাগুলোর আকার, রং ও ধরন দেখেছেন, সেগুলো কোন ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি তা শনাক্ত করেছেন, এবং এগুলো কোথা থেকে আসতে পারে তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

সব মিলিয়ে গবেষণাটি বলছে, সয়াবিন তেলের নিরাপত্তা নিয়ে এখন আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তেল উৎপাদন, ফিল্টারিং, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে ভালো মান নিয়ন্ত্রণ দরকার। নিরাপদ প্যাকেজিং, পরিষ্কার সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সরকারি নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে, বিশেষ করে খোলা তেল, পুরোনো প্লাস্টিক পাত্রে রাখা তেল, বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিক্রি হওয়া তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে।

মূল গবেষণা পত্রটি পড়ুন এখানে





আরো দেখান
Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading