রুয়ান্ডার বনে বাংলাদেশি গবেষকের এক বছর: শিম্পাঞ্জি কি সত্যিই আবহাওয়া বুঝতে পারে?

প্রতি সন্ধ্যায় রুয়ান্ডার বনে শিম্পাঞ্জিরা নতুন একটি বাসা বানিয়ে ঘুমাতে যায়। কিন্তু এই “রোজকার” কাজটি আসলে এক বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ! তারা হয়তো আগেভাগেই টের পায়, রাতে ঠান্ডা পড়বে নাকি বৃষ্টি আসবে।

গবেষণার মূল ফলাফলের ইনফোগ্রাফিক। উপরে বাঁয়ে দেখা যাচ্ছে রুয়ান্ডার নিউংওয়ে বনের একটি শিম্পাঞ্জি। ডায়াগ্রামগুলো দেখাচ্ছে কীভাবে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাসার গভীরতার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে এবং শিম্পাঞ্জিরা কীভাবে বাসার স্থান ও গাছ বেছে নেয়। | সৌজন্যে: গবেষণাদল

২০২৬ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় জার্নাল Current Biology-তে প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া (UWA)-র স্কুল অব হিউম্যান সায়েন্সেস-এর পিএইচডি গবেষক হাসান আল রাজি। তাঁর সাথে সহ-লেখক হিসেবে ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর সাইরিল গ্রুটার এবং প্রফেসর শেন মালোনি। আল রাজির পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় হলো পাহাড়ি বনে পূর্ব আফ্রিকার শিম্পাঞ্জিদের আচরণগত বাস্তুবিদ্যা। এই গবেষণাটি সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে রুয়ান্ডার নিউংওয়ে ন্যাশনাল পার্কে, যেটি মধ্য আফ্রিকার একটি ঘন পার্বত্য বর্ষারণ্য, এবং অনন্য কারণ এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ থেকে ২,৯৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখানকার আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা, আর্দ্র এবং খুবই পরিবর্তনশীল যা শিম্পাঞ্জিদের জন্য একটি বিশেষ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। পূর্ব আফ্রিকার নিম্নভূমির শিম্পাঞ্জিদের তুলনায় এখানকার শিম্পাঞ্জিরা কীভাবে এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে, সেটাই ছিল মূল জিজ্ঞাসা।

টানা বারো মাস ধরে আল রাজি এবং তাঁর দল প্রতিদিন সন্ধ্যায় শিম্পাঞ্জিদের বাসা তৈরির প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। পরের দিন সকালে প্রতিটি বাসা খুঁটিনাটি পরীক্ষা করা হয়েছে, বাসার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা, পুরুত্ব, ব্যবহৃত গাছপালার ধরন এবং বাসার অবস্থান সব কিছু নথিভুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে, বাসা বানানোর সময় এবং সারারাত ধরে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি ও বৃষ্টির পরিমাণ রেকর্ড করা হয়েছে। গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন কোন পরিবেশগত কারণ, বাসা বানানোর সময়কার আবহাওয়া, নাকি রাতের পরবর্তী আবহাওয়া? কোনটি শিম্পাঞ্জিদের বাসা তৈরির সিদ্ধান্তকে বেশি প্রভাবিত করে?

রুয়ান্ডার নিউংওয়ে ন্যাশনাল পার্কের ঘন বনের মধ্যে গবেষকরা আবহাওয়া পরিমাপের যন্ত্রপাতি (ওয়েদার স্টেশন) স্থাপন করছেন। গবেষণার ১২ মাস জুড়ে এভাবে প্রতিটি বাসার কাছের মাইক্রোক্লাইমেটের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। | ছবি: হাসান আল রাজি/গবেষণাদল

গবেষণা সম্পর্কে জনাব হাসান যেমনটা বলছিলেন, আমরা দেখেছি শিম্পাঞ্জিরা খুব সতর্কভাবে বেছে নেয় কোথায় ও কীভাবে বাসা বানাবে। তারা উষ্ণ ও কম বাতাসযুক্ত জায়গা পছন্দ করে এবং ঠান্ডা বা ভেজা পরিবেশে মোটা, গভীর বাসা তৈরি করে।

গবেষণায় একাধিক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। শিম্পাঞ্জিরা শুধু বর্তমান পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে না, তারা যেন আসন্ন রাতের কথা মাথায় রেখেই বাসা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। গবেষকদল মূলত ৪ টি বিষয়ে ফলাফল প্রকাশ করেছেন,
১। উষ্ণ মাইক্রোক্লাইমেট বেছে নেওয়া: শিম্পাঞ্জিরা আশেপাশের পরিবেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত উষ্ণ, আর্দ্র এবং কম বাতাসযুক্ত জায়গায় বাসা বানায়।
২। মোটা ও গভীর বাসা: রাত ঠান্ডা বা বৃষ্টির হলে শিম্পাঞ্জিরা তুলনামূলকভাবে পুরু ও গভীর বাসা তৈরি করে, যা ভালো তাপ-নিরোধক হিসেবে কাজ করে।
৩। বৃষ্টির আগে উঁচু গাছ: বৃষ্টির রাতের আগে তারা উঁচু গাছ ও ঘন ছাউনিযুক্ত স্থান বেছে নেয় বৃষ্টি ও ঠান্ডা থেকে সুরক্ষার জন্য।
৪। ভবিষ্যতের আবহাওয়া অনুমান: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাসা তৈরির সিদ্ধান্ত বাসা বানানোর সময়কার নয়, বরং রাতের পরবর্তী আবহাওয়ার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

যদিও, এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ করে না যে শিম্পাঞ্জিরা মানুষের মতো “আবহাওয়ার পূর্বাভাস” দিতে পারে। তবে, প্রফেসর গ্রুটার মনে করেন, ফলাফলগুলো নিঃসন্দেহে চিন্তা জাগানিয়া। তিনি বলেন এই আবিষ্কারটি ইঙ্গিত করে যে শিম্পাঞ্জিরা সম্ভবত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা বাতাসের সূক্ষ্ম পরিবর্তন থেকে আসন্ন আবহাওয়ার সংকেত বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী আচরণ পরিবর্তন করে।

এই গবেষণা শিম্পাঞ্জিদের আচরণগত নমনীয়তা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। কোনো প্রাণী কতটা “ভবিষ্যৎমুখী” হতে পারে, সেই প্রশ্নটি প্রাইমেটোলজি ও তুলনামূলক জ্ঞানতত্ত্বের কেন্দ্রীয় একটি বিষয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পায়: পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হলে শিম্পাঞ্জিরা কি এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করে টিকে থাকতে পারবে?

গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণার মাধ্যমে জানা যাবে, শুধু শিম্পাঞ্জি নয়, অন্য প্রাণীরাও কি আবহাওয়ার আগাম সংকেত ব্যবহার করে নিজেদের প্রস্তুত করে?

মূল গবেষণাটি বিনামূল্যে পড়তে ক্লিক করুন এখানে

আরো দেখান

Related Articles

Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading