বিছনাকান্দি

মামুন ভাইয়ের থিসিসের সময়ের ঘটনা। নাবিল মিয়া, ইকো-‘০৯ সিলেটী, পালসার-আরোহী, পুরোদম ঘুরুন্চি। এটাসেটা নিয়ে গপ-সপ করতে করতে জিগ্যেস করে বিছনাকান্দী গিয়েছি কী না। বল্লাম নাহ। প্রাক-জাফলং যুগে নাকি বিছনাকান্দীই এখন (এবং অনেক আগে থেকেই) শান-শওকতের রক্ষক। তো যেতেই হবে সেখানে।  যাবো যাবো করে থিসিস পার হয়ে যায়। লিটু ভাই আর নাসির এবার সিলেট আসলে খাদিম যাবার শিডিউল বদলে ১০ তারিখ দুপুরে জননী রেস্টুরেন্ট থেকে দুই পিস সিংগারা-সমুচা মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে টিটু ভাইয়ের বাইকের বদৌলতে, ইতোমধ্যে রওনা দেয়া ৫ জনের সিএনজিতেকষ্ট বাড়াতে ষষ্ঠজন হিসেবে উঠে পড়ি। আম্বরখানা পর্যন্ত লোকাল। তারপর হাদারপার বাজার যাওয়ার সিএনজিটা পাওয়া একটু কষ্টসাধ্য। ৪৫০ টাকা দিয়ে ঠিক হলো। রাস্তা বেশি নাম তবে রাস্তার অবস্থা বেশি ভালোওনা। নিয়মিত পাথরের ট্রাক যাতায়াত করে আর মারাত্মক সরু হাওয়ার সিএনজি রাস্তা থেকে নামায়ে দিতে হয় যদি পাশ দিয়ে ট্রাক যায়। তো যা হোক দেরীতে শুরু করায় লিটু ভাই এর খোচা খেয়ে দোলন ভাই আর নাসির মিয়ার মুড একটু অফ। আমি, রাশেদ ভাই আর নাবিল এই সুযোগের সদ্যবহার করতে করতে সিএনজি চলছিলো টিপিকাল সিটী সমভূমির গ্রাম্য মেঠোপথের মধ্য দিয়ে। হঠাত একটা কালভার্ট পার হতেই লিটু ভাই সিএনজি থামালেন। থাম থাম রোলার রোলার, কয়টা শট নিয়েই যাই, দোলন ক্যামেরা বের কর। সরিষা ক্ষেত। তাতে চড়ুই আর মেঠো পিপিট (Paddy-field Pipit) দের ফোরেজিং দেখলাম। দোলন ভাই পাইলো সুইচোরার ভাল কিছু শট। ওয়ার্ম আপ শেষ করে সিএনজিতে উঠতে থাকলাম সবাই। হঠাত নাসিরের চোখে পরলো দূরে সাদা কোন পাখির।লিটু ভাই ১০০-৪০০ নিয়ে দৌড় দিলেন একটা আমার চোখে একমাস হল চশমা নাই, সময় হয়না বানানোর দূর থেকে কিছু বুঝতেসিলাম না। রাশেদ ভাই তার চশমাটা আমার চোখে লাগায়ে দিতেই আমিও একটা দৌড়। পাইড হ্যারিয়ার!

.

পাইড হ্যারিয়ার

চমতকার একটা পাখি তাও আবার এক জোড়া! রাশিয়ার আমূর উপত্যকা এলাকার শীত থেকে বাঁচতে শীতে এসময় চলে আসে বাংলাদেশে। সাদার ওপর কালো ছোপ। লম্বা-শক্তিশালী পাখা। এদের বৈশিষ্ট হল ধানক্ষেতের খুব কাছদিয়ে উড়তে থাকে আর একজন আরেকজনকে ঘিরে গোল গোল উড়তে থাকে। এদের সায়েন্টিফিক নেম ‘সারকাস মেলানোলিউকোস’ এই বৈশিষ্ট থেকেই নেয়া হয়েছে। আনন্দের বিষয় ওরা দুজন এটাই করছিলো। চারজনের ক্যামেরার ক্লিকের মধ্য দিয়ে ধানক্ষেতের শিকারী দুজন উড়াল দিয়ে আনরিচেবলের দিকে হারিয়ে গেল। ম্যানুয়াল ফোকাসে আমি উড়ন্ত অবস্থায় ভাল ছবি পেলাম না। লিটু সাহেব স্বাভাবিক ভাবেই দান মেরে দিলেন। মনটা সত্যিই সবার ভরে গেল। গাড়িতে ফরলাম। নাবিলের মতে, আর আধা ঘন্টা লাগবে হাদারপার বাজার।

সেই আধাঘন্টা শেষ হবার কথা ছিলেো যদিও বেশ আগেই।  তবে প্রায় ২.৫ ঘন্টা লেগে গেল হাদারপার পৌছাতে। সেখানে নামতেই পরিবর্তন লক্ষ করা গেল সিলেটী শ্যামলীমার। গাছগুলো সব সবুজ থেকে ধূলোমাখা হলুদ আর ধূসর হয়ে গিয়েছে। কারণ আর কিছুই নয়, ট্যাফে, সোনালীকা আর আইশার ব্রান্ডের পাথরবাহী শতশত ট্রাক্টর। বাজার থেকে বিছানাকান্দি যাবার উপায় হেঁটে কিংবা ট্রাক্টরে। নাবিল মিয়া সেই এবরো-থেবরো পথে ট্রাক্টর রাইডের থ্রিলের কথা আগেই জানিয়ে রেখেছিলো। আমরাও উঠে পরলাম সবাই একটা খালি ট্রাক্টরে। ছবি নেয়া দূরের কথা একজন আরেকজনের কোমর ধরে কোনমতে ১০মিনিট টিকে আমরা নেমে গেলাম। ২০ ফুটের রাস্তা থেকে হঠাতই রাজস্তানের যেন কোন মরুদ্যানে চলে আসলাম আমরা।

রণাঙ্গণের ‘চ্যারিওট’ বা রথের মতো একেকটা ট্রাক্টর ধূলো উড়িয়ে চারপাশ একদম মাতিয়ে রেখেছিলো। ধূলো আর সাথে সিলেটের সোনালী আলো উন্মুক্ত সেই মাঠকে দিয়েছিলো নাটকীয় একটি আবহ। চারিদিকে পাথর আনা-নেয়ার তোড়জোড়।  স্ন্যাপ নিতে নিতে আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম বিছনাকান্দি কোয়ারির দিকে।

প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে বর্ষার আগ পর্যন্ত পাথর হারভেস্ট করা হয়। জানলাম আমাদের হাঁটার পথে পরিচয় হওয়া শামসুদ্দীন ভাই এর কাছে। পাথর উত্তোলনের জন্য প্রতি সিজনে জমি ইজারা দেয়া হয়। সেখানে জায়গা ভেদে ১০-১২ ফুট নিচ থেকে পাথরের লেয়ার শুরু হয়। খনন কূপ গুলোকে বলা হয় ‘গাত্তা/গাতা’। এবছর এরকম একটি গাতা চার জন মিলে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা দিয়ে ইজারা নিয়েছেন ৪ বন্ধু্। ইতোমধ্যে পুরো টাকাই উঠে এসেছে। এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিছনাকান্দি গ্রাম। প্রায় ১২ হাজার লোক কাজ করে কোয়ারিতে। মজুরিও ভালো, যদিও অমানুষিক পরিশ্রম। দৈনিক কেউ কেউ ৮০০ টাকাও জমা করতে পারে। সুনামগঞ্জ, ভোলাগঞ্জ, সিলেট, মানিকঞ্জ, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ থেকেও আসে শ্রমিকেরা। যারা স্থায়ী বাসিন্দা বর্ষায় পানি উঠলে কৃষিকাজ করে।

শামসুদ্দীন

গ্রামে প্রাইমারি স্কুল আছে একটা, শিক্ষার হার খুব কম। স্যানিটেশনের অবস্থা শোচনীয়। কোন এনজিও কার্যক্রম আমাদের চোখে দেখা দেয়নি যদিও সৌর বিদ্যুত অনেক বাড়িতে পৌছেছে। পাথরের সময় বিকেল বেলা কাজ শেষে হাজার হাজার মানুষ যখন বাড়ি ফেরে, সত্যিই অদ্ভুত লাগে! আমরা কোয়ারিতে আসতে আসতে সূর্য দিগন্তের কাছে চলে আসে। মজার কিছু ব্যপার খেয়াল করি। এখানে বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম পাথর। মসজিদের জন্য দান কিংবা রাস্তার টোলের জন্য সাইনবোর্ডে লিখা ‘পাথর ফেলুন’।

কোয়ারির ‘গাতা’

কোয়ারির শেষ মাথায় ভারতের সাথে আমাদের সীমান্ত। কষ্ট লাগে, তারা সবই নিয়ে গিয়েছে। ওপারে দুটো পাহাড়ের মাঝে উপত্যকার মুখ হলো জিরো পয়েন্ট। গাতা গুলোর সাথেই অনেক শ্রমিকের ক্ষণস্থায়ী আবাস, তার উপর বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়ছে। সাবধান করা হলো জিরো পয়েন্টের কাছে না যেতে। আমরা শেষ সময়ের ব্যস্ততার কিছু ছবি নিলাম।  এতো এবরো থেবরো পথে ট্রাক্টরগুলো যে কীভাবে চলে, মাঝে মাঝে সামনের চাকা ক্ষণিকের জন্য ২ ফুট উঠে যায়! যারা কাজ করে ভনেকের সাথেই গাল-গল্প করলাম। প্রাণ খোলা হাসি দেখলাম। খুব আমুদে মানুষ সবাই। পকেটে সবার চাইনিজ ফোন। ক্লান্তি ভুলতে শেষ বিকেলে হীম-শীতল পানিতে শরীর এলাচ্ছিলো কেউ কেউ।পানির মাঝে জেগে থাকা বালিয়াড়িতে এসে বসলো দুই জোড়া কাদাখচা পাখি। সেই অবশিষ্ট স্বচ্ছ পানিতে ডুবন্ত সূর্যকে মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে থাকলাম আমরা।

শহস্র মানুষের কর্মসংস্থান করেছে বিছানাকান্দি। তবে কিসের বিনিময়ে তাও বুঝলাম আমরা। জাফলং-এর চেয়ে দ্বিগুণ সুন্দর একটি ভূসর্গ ছিলো এটি। বর্ষায় কিছুটা হলেও এর আদীরূপ ফিরে পেলেও প্রাকৃতিক আরেকটি সৌন্দর্য আমরা হারিয়েছি বললে ভুল হবেনা। ফেরার পালা। মারাত্মক ক্লান্ত আমরা। আলোও নিভে আসছে। ট্রাক্টরেই চেপে বসলাম আমরা সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে। তারা ভরা আকাশে ২৫ মিনিটের সেই ফিরতিপথ নি:স্বন্দেহে সারা জীবনই মনে থাকবে! মুঠো-মুঠো মুগ্ধতা দিয়েই বিছানাকান্দি বিদাই জানালো…

বিছনাকান্দি গ্রামের শেষ মাথা

লেখকঃ রেজা নূর মইন, প্রকৃতিপ্রেমী,, সৌখিন ফটোগ্রাফার

ছবি কৃতিত্বঃ লেখক স্বয়ং 

আরো দেখান

৩ Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button

Discover more from EnvironmentMove.earth

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading